অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিকে ঘিরে অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে। বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকদের একাংশের মতে, চুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা তুলনামূলকভাবে কম।
চুক্তির অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো এতে বারবার ব্যবহৃত ‘শ্যাল’ শব্দ। নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরো চুক্তিতে ‘শ্যাল’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ১৭৯ বার, আর ‘উইল’ মাত্র ৩ বার। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক চুক্তির ভাষায় ‘শ্যাল’ শব্দ সাধারণত বাধ্যতামূলক শর্ত নির্দেশ করে। ফলে এই শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার চুক্তিটিকে একতরফা বলে মনে করার যুক্তি আরও জোরদার করেছে।
চুক্তিটি গত ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত হয় বলে জানা গেছে, জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের কাছাকাছি। এরপর বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। অনেক রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠন চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের দাবি জানায়। সংসদেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং কিছু সদস্য এটিকে বাংলাদেশের স্বার্থের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভারসাম্যহীন বলে মন্তব্য করেন।
চুক্তির কাঠামোতে মোট ছয়টি মূল ধারা রয়েছে এবং বাস্তবায়নের বিস্তারিত অংশ সংযুক্তিতে দেওয়া হয়েছে। এতে শুল্ক ও কোটা ব্যবস্থায় পরিবর্তন, অশুল্ক বাধা কমানো, কৃষিপণ্য ও শিল্পপণ্যের বাজার উন্মুক্তকরণ, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, ডিজিটাল বাণিজ্য সহজীকরণ, শ্রমনীতি সংস্কার এবং পরিবেশগত নীতি শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
শুল্ক ব্যবস্থায় বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর ধাপে ধাপে শুল্ক কমাতে বলা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় শেষে শূন্য শুল্কের কথাও বলা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের কিছু পণ্যের জন্য শুল্ক সুবিধার কথা উল্লেখ থাকলেও তা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
অশুল্ক বাধা সংক্রান্ত অংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে মার্কিন পণ্যের আমদানিতে অতিরিক্ত লাইসেন্স, মান যাচাই বা কাগজপত্রের জটিলতা কমাতে হবে। কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদিত সনদ গ্রহণের বিষয়ও রয়েছে।
ডিজিটাল বাণিজ্য অংশে বাংলাদেশকে ডিজিটাল সেবার ওপর বৈষম্যমূলক কর আরোপ না করার এবং তথ্য প্রবাহ সহজ করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা ট্রান্সফার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে।
শ্রম ও পরিবেশ খাতে শ্রমিক অধিকার, ইউনিয়ন গঠন, ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর নীতি গ্রহণের শর্ত রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব শর্ত উন্নয়নশীল দেশের জন্য বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
চুক্তিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ, দুর্নীতি দমন এবং সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ সহজ করার জন্য বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজীকরণের শর্ত রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, চুক্তির কিছু অংশ বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে। তবে একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ শিল্প, কৃষি ও নীতিনির্ধারণে চাপ তৈরি হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
অন্যদিকে সরকারি পর্যায়ে বলা হচ্ছে, এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক সম্পর্ক জোরদারে সহায়ক হবে। তবে এটি বাস্তবায়নের সময় জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই এগোনো হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি এখন দেশের অর্থনৈতিক আলোচনায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। চুক্তির বাস্তব প্রভাব কী হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে এর বাস্তবায়ন ও আলোচনার গতিপ্রকৃতির ওপর।



