রাজধানীর আদ্–দ্বীন হাসপাতালে এসি বন্ধ থাকা, অক্সিজেনের স্বল্পতা ও কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলায় ৩ ঘণ্টায় ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাসপাতালটির লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে ৭২ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়ে শোকজ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
রাজধানীর আদ্–দ্বীন হাসপাতালে মাত্র ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে ৬ নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় গঠিত পৃথক দুটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ‘ অধ্যাদেশের সুনির্দিষ্ট বিধান লঙ্ঘন করায় কেন হাসপাতালের লাইসেন্স চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হবে না, তা এই নোটিশে জানতে চাওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শোকজ নোটিশটি আদ্–দ্বীন হাসপাতালের মূল ফটকে (গেটে) লটকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নোটিশের আনুষ্ঠানিক জবাব দেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে মাত্র ৭২ ঘণ্টা অর্থাৎ আগামী রবিবার (৭ জুন) বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে, গত বুধবার (৩ জুন) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি এবং বৃহস্পতিবার সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত ৩ সদস্যের বিশেষ তদন্ত কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। গত ২৭ মে ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে হাসপাতালটির পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই ৬ নবজাতকের মৃত্যু হয়েছিল। পরদিন ২৮ মে এই ঘটনায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হলেও এখন পর্যন্ত এজাহারনামীয় কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসা ৫টি ভয়াবহ তথ্য
১. অনুপযুক্ত অবকাঠামো: যে ভবনটিতে হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছিল, তা সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ। ২. অক্সিজেন সংকট ও নার্সদের উদাসীনতা: কক্ষের ভেতর হঠাৎ অক্সিজেন কমে গিয়ে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। এ সময় মুমূর্ষু শিশুদের অভিভাবকরা বারবার আকুতি জানালেও ডিউটিতে থাকা নার্সরা কোনো সহযোগিতা করেননি। ৩. অতিরিক্ত ভিড়: ওয়ার্ডটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী ও স্বজনদের উপস্থিতি ছিল। 4. ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা: হাসপাতাল পরিচালনার জন্য পরিচালনা পর্ষদ বা কর্তৃপক্ষ ন্যূনতম কোনো উপযুক্ত ও জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ৫. ভবিষ্যত সুপারিশ: ভবিষ্যতে যেকোনো বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স দেওয়ার আগে ভবনের উপযুক্ততা কঠোরভাবে পরিদর্শনের সুপারিশ করেছে কমিটি।
যেভাবে ঘটল ৬ নবজাতকের মৃত্যু
তদন্ত প্রতিবেদনে নবজাতকদের মৃত্যুর মূল কারণ হিসেবে সেন্ট্রাল এসি বন্ধ থাকা, তীব্র অক্সিজেন স্বল্পতা এবং ছোট কক্ষে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ওই সংকটাপন্ন সময়ে ওয়ার্ডে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের না থাকা, নার্সদের অমানবিক অসহযোগিতা এবং সার্বিকভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম ও ফৌজদারি অপরাধমূলক অবহেলা প্রমাণিত হয়েছে।
এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদনের বিস্তারিত তুলে ধরেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “সম্ভবত মৃত্যুর মূল কারণ ছোট কক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে এসি বন্ধ থাকা। প্রয়োজনীয় এসি ও ভেন্টিলেশন না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে অক্সিজেনের তীব্র স্বল্পতা তৈরি হয় এবং বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।” তিনি আরও যোগ করেন, পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের মতো একটি অতি সংবেদনশীল জায়গায় অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাসপাতাল প্রশাসন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। কর্মকর্তাদের এই অবহেলা এখন স্পষ্ট ও প্রমাণিত, তাই দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী আদ্–দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



