জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান গোলরক্ষক কোচ আশরাফুল রানা এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত মাঠ, ক্লাব ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের মাধ্যমে তৃণমূলের সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে বাংলাদেশও একদিন ফুটবল বিশ্বকাপ খেলবে।
বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক সফল অধিনায়ক ও তারকা গোলরক্ষক আশরাফুল ইসলাম রানা দেশের ফুটবল নিয়ে তাঁর সুদূরপ্রসারী স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি দৃঢ় আশাবাদ প্রকাশ করে বলেছেন যে, দেশের তৃণমূল পর্যায়ের খেলোয়াড়দের জন্য যদি পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশও একদিন বিশ্ব ফুটবলের মহাকুম্ভ তথা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার গৌরব অর্জন করবে। দৈনিক যুগান্তরের সাথে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের ফুটবলের বর্তমান সংকট, মাঠের অপ্রতুলতা, খেলোয়াড়দের সুযোগ-সুবিধা এবং আসন্ন বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের অনুভূতি ও ফুটবলীয় ভাবনার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। রানা বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে অসংখ্য প্রতিভাবান ফুটবলার লুকিয়ে আছে, যাদের সঠিক পরিচর্যা করা জরুরি।
আশরাফুল রানা দেশের ফুটবলকে শক্তিশালী করতে কাঠামোবদ্ধ পরিবর্তনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, গ্রামগঞ্জের বা মফস্বলের ভালো খেলোয়াড়দের যদি আমরা ঠিকমতো দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যা করতে পারি, তবে আমাদের জাতীয় ফুটবল দল অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এ জন্য খেলোয়াড়দের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। আর এই বিশাল যজ্ঞ সফল করতে কেবল সরকারের ওপর নির্ভর না করে সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তি এবং দেশের বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও ফুটবলের স্পন্সর হিসেবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। দেশের মাঠ সংকটের কথা উল্লেখ করে রানা আক্ষেপের সাথে বলেন, আমাদের দেশে শিশু-কিশোরদের খেলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ নেই। গ্রামগঞ্জের যে দু-একটি মাঠ অবশিষ্ট আছে, সেগুলোতেও এখন নিয়মিত হাট-বাজার বসে। ফলে নতুন প্রজন্ম খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বদলাতে প্রতিটি গ্রাম ও জেলা শহরের ক্লাবগুলোতে সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহলের উদ্যোগে খেলার পরিবেশ তৈরি করা উচিত।
সাক্ষাৎকারে রানা নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের এক বাস্তব ও নির্মম অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন। তিনি জানান, তিনি যে গ্রামে বড় হয়েছেন সেখানে খেলার উপযোগী কোনো মাঠই ছিল না। এমনকি নিজ জেলা মানিকগঞ্জেও তিনি ফুটবলার হওয়ার মতো তেমন কোনো সুযোগ পাননি। বাধ্য হয়ে ক্যারিয়ার গড়তে তাঁকে ঢাকায় চলে আসতে হয়েছিল। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমি মানিকগঞ্জের তৈরি খেলোয়াড় না, আমি ঢাকার মাটিতে তৈরি হয়েছি।” তিনি চান, আগামী দিনে যারা দেশের জন্য খেলবে, তারা যেন নিজ জেলা থেকেই আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় হিসেবে তৈরি হতে পারে। এ জন্য প্রতিটি জেলায় উন্নতমানের ক্রীড়া মাঠ এবং পেশাদার ক্লাব গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন।
পেশাদার ফুটবলার হওয়ার অদম্য টানে আশরাফুল রানা একসময় স্বেচ্ছায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্থায়ী চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। ২০১৪ সালে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা আবাহনী ক্লাবের হয়ে খেলার মাধ্যমে তাঁর পেশাদার ফুটবল যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০১৫ সালে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের গোলরক্ষক হিসেবে তাঁর আন্তর্জাতিক অভিষেক ঘটে। দেশের জার্সিতে তিনি প্রায় ৩০-৩৫টি ম্যাচে অংশগ্রহণ করেছেন এবং দক্ষতার সাথে জাতীয় দলের অধিনায়কের মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন। দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ক্লাবে দাপটের সাথে খেলার পর, বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের গোলরক্ষক কোচ হিসেবে নতুন প্রজন্মকে তৈরি করার দায়িত্ব পালন করছেন।
আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এই সাবেক তারকা জানান, পুরো বিশ্বের মতো এ দেশের মানুষের মনেও বিশ্বকাপ নিয়ে এক দারুণ উৎসব ও উন্মাদনা কাজ করছে, যা একজন ফুটবলার হিসেবে তাঁর মধ্যেও দোলা দেয়। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনার একজন কড়া সমর্থক। তবে আর্জেন্টিনার পাশাপাশি এবারের বিশ্বকাপে স্পেন, জার্মানি, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের মতো ইউরোপীয় দলগুলোও দুর্দান্ত খেলবে বলে তিনি মনে করেন। তবে দিন শেষে ফুটবলের চিরায়ত সত্য মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, মাঠের ৯০ মিনিটে যারা সেরা খেলাটা উপহার দেবে, ফলাফলটা দিন শেষে তাদের পক্ষেই যাবে। তিনি বিশ্ববাসীকে একটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও সুন্দর বিশ্বকাপ উপহার দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।



