বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ার ধারাবাহিকতার মধ্যেই শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো। আগস্ট ২০২৬ ছিল বিশ্বের উষ্ণতম আগস্ট এবং যৌথভাবে রেকর্ডের উষ্ণতম মাস। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রার হিসাবে ২০২৬ এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, এল নিনোর প্রভাব আরও বাড়লে বছরের বাকি সময়েও তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।
কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৬-এ বৈশ্বিক গড় ভূপৃষ্ঠের বায়ুর তাপমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের গড়ের তুলনায় এটি ০ দশমিক ৮৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। একই সঙ্গে ১৮৫০ থেকে ১৯০০ সালের প্রাক-শিল্পযুগের গড়ের তুলনায় আগস্টের তাপমাত্রা ছিল ১ দশমিক ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।
আগস্টের এই তাপমাত্রা জুলাই ২০২৩-এর সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বের ইতিহাসের উষ্ণতম মাসের রেকর্ডে রয়েছে। অস্বাভাবিকভাবে এ বছর আগস্ট জুলাইয়ের চেয়েও উষ্ণ ছিল। ১৯৪০ সাল থেকে সংরক্ষিত কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, একই বছরে জুলাইয়ের চেয়ে আগস্ট উষ্ণ হওয়ার ঘটনা এর আগে মাত্র চারবার ঘটেছে—১৯৪৫, ১৯৫১, ১৯৫৫ ও ১৯৮৫ সালে।
জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত হিসাবেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এই আট মাসে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রার হিসাবে ২০২৬ এখন পর্যন্ত রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর, ২০২৪-এর পরেই অবস্থান করছে। তবে বছরের শেষ চার মাসের তাপমাত্রা যদি ২০২৩ সালের শেষ চার মাসের মতো হয়, তাহলে ২০২৬ সালের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ২০২৪ সালের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে কোপার্নিকাস।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাতেও রেকর্ড তৈরি হয়েছে। আগস্টে মেরু অঞ্চল বাদে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিল রেকর্ড সর্বোচ্চ। ২৪ ও ২৫ আগস্ট দৈনিক সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২১ দশমিক ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা আগের রেকর্ডের চেয়ে বেশি।
আবহাওয়াবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত শক্তিশালী হওয়া এল নিনো এ পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করছে। একিউওয়েদারের বিশেষজ্ঞ আবহাওয়াবিদ টাইলার রয়স বলেছেন, বায়ুমণ্ডল থেকে সমুদ্র পর্যন্ত ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে। এর ওপর দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো যুক্ত হওয়ায় শরৎ ও শীত মৌসুমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র, যার সময় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা সাময়িকভাবে আরও বাড়তে পারে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও ঝড়ের গতিপথে পরিবর্তন আসতে পারে।
২০২৬ সালের এল নিনো ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেট অফিস জানিয়েছে, চলতি বছরের জুনে প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পরবর্তী পূর্বাভাসগুলোতে এই এল নিনোকে অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
মেট অফিসের আগস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হতে পারে—যা ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত বড় মাত্রার এল নিনোর ইঙ্গিত। সংস্থাটি বলেছে, পূর্বাভাস সঠিক হলে ২০২৬ সালের এল নিনো সাম্প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতাকে অনেকটাই ছাড়িয়ে যেতে পারে।
একিউওয়েদারের পূর্বাভাসেও এল নিনো আরও শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আগস্টের মাঝামাঝি সংস্থাটির বিশেষজ্ঞরা জানান, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। তাঁদের মতে, এ ধরনের শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও ঝড়ের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।
এল নিনোর প্রভাব কেবল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না। বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহ ও জেট স্ট্রিমের পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরন বদলে দিতে পারে। মেট অফিস জানিয়েছে, এল নিনোর প্রভাবে ভারতের মৌসুমি বৃষ্টিপাতসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক আবহাওয়া ব্যবস্থাও প্রভাবিত হতে পারে।
বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার সঙ্গে এমন শক্তিশালী প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি একত্র হলে চরম তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, খরা এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। ২০২৬ সালের আগস্টে বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছিল বলে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, যা অতিরিক্ত তাপ ও ভারী বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, একটি নির্দিষ্ট মাস বা একটি এল নিনো পর্বের তাপমাত্রা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের পুরো চিত্র নির্ধারণ করা যায় না। তবে ২০২৬ সালের রেকর্ড তাপমাত্রা, উষ্ণ সমুদ্র এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পদক্ষেপের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করছে।



