মায়াস্থেনিয়া গ্র্যাভিসে আক্রান্ত ১১ বছরের এক শিশুর বুক না কেটেই রোবটের সহায়তায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পরদিন সকালেই চিকিৎসকের সঙ্গে ফুটবল খেলেছে শিশুটি। চিকিৎসকদের ভাষ্য, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় রোবোটিক সার্জারিতে ছোট ছিদ্র করে অস্ত্রোপচার করায় রোগী দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
শিশুটি দীর্ঘদিন ধরে মায়াস্থেনিয়া গ্র্যাভিস নামের এক ধরনের স্নায়ুরোগে ভুগছিল। রোগ নিয়ন্ত্রণে তাকে উচ্চমাত্রার ওষুধ নিতে হতো। রোগটি সারাতে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিলে প্রচলিত পদ্ধতিতে বুকের হাড় কেটে অস্ত্রোপচার করতে হতো। কিন্তু অস্ত্রোপচারের কথা শুনে শিশুটি ভয় পেয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরাও বুক কেটে অস্ত্রোপচারে রাজি ছিলেন না। এভাবে প্রায় ছয় মাস কেটে যায়।
এর মধ্যে গত ৩১ আগস্ট রাজধানীর ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে রোবোটিক সার্জারির মাধ্যমে তিনটি অস্ত্রোপচার করা হয়। হাসপাতালের এন্ডো-ল্যাপারোস্কপিক অ্যান্ড রোবোটিক সার্জারি বিভাগের ভিজিটিং কনসালট্যান্ট ও অ্যাডভান্সড এন্ডো–ল্যাপারোস্কপিক সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক রফিকুস সালেহীন রোবটের সহায়তায় এক পুরুষ রোগীর পিত্তথলি অপসারণ করেন।
একই দিনে হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান ও চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক সামছাদ জাহান রোবটের সহায়তায় এক নারী রোগীর জরায়ু অপসারণ করেন।
ওই শিশুটিও একই হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদের তত্ত্বাবধানে ছিল। তিনি শিশুটির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে ৩১ আগস্ট সন্ধ্যায় শিশুটির পরিবার হাসপাতালে আসে।
২ সেপ্টেম্বর রোবটের সহায়তায় অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ শিশুটির প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করেন। এতে বুকের হাড় কাটতে হয়নি। শরীরে ছোট কয়েকটি ছিদ্র করেই পুরো অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়।
অস্ত্রোপচারের পরদিন সকালেই চিকিৎসকের সঙ্গে ফুটবল খেলেছে শিশুটি। অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘প্রচলিত ধারায় এ ধরনের অস্ত্রোপচারের পর দেড় মাস আমরা ভারী কাজ করতে দিই না। তিন মাস পরে রোগীকে বাইরে বেরোতে দিই। ছয় মাস পরে খেলাধুলার প্রসঙ্গ আসে; আর এখানে শিশুটি পরদিন সকালেই ফুটবল খেলেছে; আর যেহেতু সার্জনের সঙ্গেই খেলেছে, সার্জন নিরাপদ নিশ্চিত হয়েই পারমিশন দিয়েছেন।’
অধ্যাপক রফিকুস সালেহীন বলেন, রোবোটিক সার্জারিতে রোবট নিজে স্বাধীনভাবে অস্ত্রোপচার করে না। মূলত সার্জনের নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণেই রোবট অস্ত্রোপচারে সহায়তা করে।
প্রচলিত অস্ত্রোপচারে সার্জন নিজ হাতে বিভিন্ন কাজ করেন। রোবোটিক সার্জারিতে সার্জনের নিয়ন্ত্রণে রোবোটিক বাহু কাজ করে। সার্জনের সামনে থাকা থ্রিডি মনিটরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ত্রিমাত্রিক দৃশ্য দেখা যায়। সেই দৃশ্য দেখে সার্জন রোবোটিক বাহুগুলো পরিচালনা করেন।
পদ্ধতিটি অনেকটা ল্যাপারোস্কপিক সার্জারির মতো হলেও রোবোটিক সার্জারিতে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলো তুলনামূলক বেশি নমনীয়। এতে প্রায় ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত নড়াচড়ার সুবিধা পাওয়া যায়। ফলে শরীরের জটিল ও সূক্ষ্ম স্থানে নির্দিষ্টভাবে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়।
রফিকুস সালেহীন বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশে আগে থেকেই কিন্তু এটা (রোবোটিক সার্জারি) ছিল। আমরা একটু পিছিয়ে ছিলাম। আমি বলব, এই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আমাদের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।’
ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে ব্যবহৃত রোবটটির নাম ‘মেডবট তুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবট’। চীনে তৈরি এই রোবট ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নিতে বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা দুই দফা চীনে যান। সেখানে ধাপে ধাপে কৃত্রিম অঙ্গ ও প্রাণীর অঙ্গে অস্ত্রোপচারের প্রশিক্ষণ নেন তাঁরা। পরে বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা চীনা চিকিৎসকদের সঙ্গে মানুষের অস্ত্রোপচারেও অংশ নেন।
এরপর তাঁরা রোবোটিক সার্জারির সনদ অর্জন করেন। মেডবট রোবটটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আনা হয়। তবে অস্ত্রোপচারের জন্য সরকারি অনুমতি না থাকায় তখনই এর ব্যবহার শুরু করা যায়নি। অনুমতি পাওয়ার পর গত মাসে প্রথম রোবোটিক অস্ত্রোপচার করা হয়।
রফিকুস সালেহীন জানান, ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ১২ জন রোগীর রোবোটিক সার্জারি করা হয়েছে। তাঁর দাবি, রোগীদের প্রত্যেকেই সুস্থ আছেন।
রোবোটিক সার্জারির মাধ্যমে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আরেকটি উদাহরণ হিসেবে ১৭ বছর বয়সী এক রোগীর অস্ত্রোপচারের কথা জানিয়েছেন হাসপাতালের চিকিৎসকেরা। হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের প্রধান ও কনসালট্যান্ট হাসিনা সাদিয়া খান রোবটের সহায়তায় ওই রোগীর পাইলোপ্লাস্টি করেন। কিডনির সঙ্গে মূত্রনালির সংযোগস্থলের সংকীর্ণতা দূর করতে এই অস্ত্রোপচার করা হয়।
হাসিনা সাদিয়া খান বলেন, ‘শিশুটি ছিল চিকন স্বাস্থ্যের। ল্যাপারোস্কপির জন্য প্রশস্ত জায়গা হলে ভালো; কিন্তু এই রোগীর পেটে জায়গা কম ছিল। এ রকম ক্ষেত্রে ভিশন বা কাজের জায়গা পাওয়া যায় না। এই রোগীর জন্য রোবোটিক সার্জরি সবচেয়ে উপযোগী। ভেতরে অনেক সুন্দর করে অল্প জায়গার মধ্যে কাজগুলো করে ফেলা গেছে।’
তিনি জানান, বিশ্বে রোবোটিক সার্জারির ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই ইউরোলজিক সার্জারি। গাইনোকোলজিতেও এ পদ্ধতির ব্যবহার বেশি। এসব অস্ত্রোপচারে শরীরের ছোট ও জটিল অংশে কাজ করতে হয়।
অধ্যাপক সামছাদ জাহান জানান, রোবোটিক সার্জারির একটি সুবিধা হলো অস্ত্রোপচারের সময় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও গঠন অনেক বড় করে দেখা যায়। প্রায় ১৫ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত বড় করে দেখা সম্ভব। এ ছাড়া সার্জনের হাতের স্বাভাবিক কাঁপুনি বা ট্রেমর ফিল্টার করা হয়। এতে আশপাশের টিস্যু তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আরও নিখুঁতভাবে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়।
রোবোটিক সার্জারিতে শরীরে ছোট ছিদ্র করে অস্ত্রোপচার করা হয়। ফলে রক্তপাত তুলনামূলক কম হয়। একই সঙ্গে ব্যথা ও শারীরিক ধকলও কম হতে পারে। অস্ত্রোপচারের পর রোগী তুলনামূলক কম সময়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘ধরুন, একজন জনপ্রিয় খেলোয়াড়। তাঁর একটি সার্জারি দরকার। আমরা যদি বুক কেটে অস্ত্রোপচার করে বলি, আগামী ছয় মাস আপনি মাঠে দৌড়াতে পারবেন না, তাহলে কিন্তু তাঁর ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে। এ রকম ক্ষেত্রে রোবোটিক সার্জারি সুবিধাজনক।’
তবে রোবোটিক সার্জারি তুলনামূলক ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে এই অস্ত্রোপচারের খরচ ল্যাপারোস্কপিক সার্জারির তুলনায় প্রায় দুই থেকে আড়াই গুণ। চিকিৎসকদের মতে, তারপরও বিদেশের তুলনায় দেশে এর ব্যয় কম।
দেশেই রোবোটিক সার্জারির সুযোগ চালু হওয়ায় চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে বলে আশা করছেন চিকিৎসকেরা। এতে দেশের অর্থ দেশের মধ্যেই থাকার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
রফিকুস সালেহীন বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে এই অস্ত্রোপচারের খরচ অনেক বেশি। সেটি তো শুধু হাসপাতালের খরচ। তারপর রোগীর সঙ্গে যিনি গেলেন, তাঁর থাকার খরচ আছে; তো আমরা মনে করি, সবকিছু মেলালে রোগীর জন্য দেশে চিকিৎসা অনেক সুবিধাজনক।’
সময়ের সঙ্গে রোবোটিক সার্জারির খরচ আরও কমে আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে দেশের বাইরের রোগীরাও তুলনামূলক কম খরচে অস্ত্রোপচার করাতে বাংলাদেশে আসতে পারেন।
রোবোটিক সার্জারি চালু হওয়ায় অভিজ্ঞ বিদেশি সার্জনদেরও অস্ত্রোপচারে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা। মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ জানান, বিদেশের অভিজ্ঞ সার্জনরা অনলাইনে যুক্ত হয়ে দূর থেকে জটিল অস্ত্রোপচার তদারক করতে পারবেন। অনুমতি সাপেক্ষে তাঁরা অস্ত্রোপচারে অংশও নিতে পারবেন।
চিকিৎসকদের মতে, ক্যানসারের অস্ত্রোপচারেও রোবোটিক সার্জারির কার্যকারিতা রয়েছে। ভবিষ্যতে কোলন, পাকস্থলী, অন্ত্র, কিডনি, প্রোস্টেট ও জরায়ুর অস্ত্রোপচারে এ প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়তে পারে।
বর্তমানে রোবোটিক সার্জারির প্রশিক্ষণের জন্য চিকিৎসকদের দেশের বাইরে যেতে হয়, যা ব্যয়বহুল। তবে দেশে এই প্রযুক্তি চালু হওয়ায় ভবিষ্যতে চিকিৎসকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও দেশে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা।
অধ্যাপক সামছাদ জাহান বলেন, ‘আমি যে ফেলোশিপ (রোবোটিক সার্জারি–সংক্রান্ত) করলাম, অনেক খরচ। আমাদের নতুন ডাক্তারদের পক্ষে সম্ভব না।…এখন দেশের স্টুডেন্টদের আমরা নিজেরাই ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারব। আমার মনে হয় যে এটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এবং আমাদের ইচ্ছা আছে।’



