চট্টগ্রাম নগরের পাথরঘাটায় রিকশাযাত্রীকে ছুরিকাঘাত করে ছিনতাইয়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সাদ্দাম হোসেন (৪৩) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশের দাবি, সাদ্দাম একজন পেশাদার ছিনতাইকারী এবং তাঁর বিরুদ্ধে নগরের বিভিন্ন থানায় ছিনতাই, দস্যুতা ও দ্রুত বিচার আইনে নয়টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
সাদ্দাম কর্ণফুলী থানার উত্তর শিকলবাহা এলাকায় বসবাস করেন। গত ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ওই এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে সাদা টি-শার্ট পরা ব্যক্তিকে দেখে সাদ্দামকে শনাক্ত করা হয়।
ঘটনাটি ঘটে ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা ৪০ মিনিটের দিকে নগরের কোতোয়ালি থানার পাথরঘাটার সতীশ বাবু লেনে। একটি রিকশাযাত্রীকে গতিরোধ করে ছোরার ভয় দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।
ভিডিওতে দেখা যায়, ব্যাটারিচালিত রিকশায় বসে থাকা এক যাত্রীর পকেট থেকে জোর করে জিনিস বের করার চেষ্টা করছেন কয়েকজন। ওই যাত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘আরে ভাই, দিতাছি তো।’ তিনি নড়াচড়া করলে একপর্যায়ে ছিনতাইকারীদের একজন তাঁর বাঁ পায়ে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। পরে ছুরি দিয়ে তাঁর পকেট কাটার দৃশ্যও দেখা যায়।
ঘটনার পর জড়িত ব্যক্তিরা ব্যবহৃত মুঠোফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান এবং অবস্থান পরিবর্তন করতে থাকেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে ডিবির টিম-৩১ ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা শুরু করে। একপর্যায়ে সাদা টি-শার্ট পরা সাদ্দামকে শনাক্ত করা হয়।
এরপর উত্তর শিকলবাহায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সাদ্দাম ওই ছিনতাইয়ের ঘটনায় মূলহোতাদের একজন এবং ভিডিওতে রিকশাযাত্রীর পায়ে ছুরিকাঘাত করা ব্যক্তিই তিনি।
পুলিশের দাবি, সাদ্দাম আগে মাছের ব্যবসা করতেন। বাবার সঙ্গে মাছের ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন তিনি। পরে বন্ধুদের সঙ্গে মিশে জুয়া ও মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়েন। জুয়া ও মাদকের টাকা জোগাড় করতে একপর্যায়ে ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, সাদ্দাম দ্রুত ছিনতাই শেষ করে ঘটনাস্থল থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ভুক্তভোগীরা জিনিসপত্র দিতে দেরি করলে তিনি ছুরি দিয়ে আঘাত করেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। ছিনতাই করা জিনিসপত্র বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুয়া ও মাদক সেবনে ব্যয় করতেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ আরও জানায়, সাদ্দামের নির্দিষ্ট কোনো প্রকাশ্য পেশা নেই। ভোরে ছিনতাই করাই ছিল তাঁর নিয়মিত কর্মকাণ্ডের একটি অংশ। ভোরে রাস্তায় মানুষের চলাচল তুলনামূলক কম থাকলেও অফিস ও পোশাক কারখানাগামী মানুষের চলাচল থাকে। এ সময় মুঠোফোন ও গলার চেইন ছিনিয়ে নেওয়াকে তিনি লক্ষ্য হিসেবে নিতেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ছিনতাইয়ের সময় পরিচয় গোপন রাখতে সাদ্দাম মুঠোফোন ব্যবহার করতেন না বলেও পুলিশ জানিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে থাকতেই মুঠোফোন বন্ধ করে দিতেন বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নগরের টেরিবাজার এলাকায় একই ধরনের একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও সাদ্দাম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ওই ঘটনায় এক নারীকে ছুরিকাঘাত করে তাঁর গলার চেইন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ছিল। পরে জামিনে বের হয়ে আবার ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম নগরে ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ে পুলিশের পরিসংখ্যান ও নাগরিকদের অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নগরের বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকা—নিউমার্কেট, কোতোয়ালি, সিআরবি, কদমতলী, রেলস্টেশন, সদরঘাট, পাথরঘাটা, লালখান বাজার, কাজীর দেউড়ি, ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, চকবাজার, দেওয়ানবাজার, অক্সিজেন মোড়, শেরশাহ, বহদ্দারহাট, ইপিজেড, অলংকার মোড়, ফয়’স লেক ও খুলশীসহ বিভিন্ন স্থানে ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, কখনো অস্ত্রের মুখে পথচারীকে থামিয়ে, আবার কখনো সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা ব্যাটারিচালিত রিকশায় এসে পথচারী ও যাত্রীদের কাছ থেকে মুঠোফোন, টাকা ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিস ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চট্টগ্রাম মহানগর ও পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের আওতাধীন ১১ জেলায় ডাকাতি, ছিনতাই, সিঁধ কেটে চুরি ও চুরির ঘটনায় ১ হাজার ৫০৬টি মামলা হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ছিনতাইয়ের মামলা ছিল ১৭৬টি।
সাদ্দামকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তার এবং ছিনতাই হওয়া মালামাল উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।



