রাজধানীর বনশ্রী ও আফতাবনগরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া রামপুরা (বেগুনবাড়ী) খালের ওপর নির্মিত ৪২ মিটার দীর্ঘ পদচারী-সেতু আজ উদ্বোধন করা হবে। ১৩ কোটি ২৮ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি চালু হলে এত দিন বাঁশের সাঁকো ও নৌকার ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় বাসিন্দাদের খাল পারাপারের ভোগান্তি কমবে।
আজ বুধবার বিকেলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান সেতুটির উদ্বোধন করবেন। এরপর এটি পথচারীদের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
ডেমরাগামী রামপুরা-বনশ্রী সড়কের ফরাজী হাসপাতালের পাশে নির্মিত সেতুটির প্রস্থ ৩ দশমিক ৮০ মিটার। স্টিলের কাঠামোর ওপর কংক্রিটের স্ল্যাব ও টাইলস বসিয়ে এতে হাঁটার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বনশ্রী ও আফতাবনগরের মাঝের খাল পারাপারে এত দিন স্থানীয় বাসিন্দাদের বাঁশের সাঁকো কিংবা নৌকার ওপর নির্ভর করতে হতো। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতিদিন এই পথে চলাচল করতে হয়। ফলে নতুন পদচারী-সেতুটি চালু হলে তাঁদের দীর্ঘদিনের যাতায়াতের ভোগান্তি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এলাকাটিতে দীর্ঘদিন ধরে পাকা সেতুর দাবি ছিল।
তবে এই পদচারী-সেতুর পাশাপাশি একই খালের ওপর আরও দুটি সেতু নির্মাণ করছে ডিএনসিসি। এর একটি পদচারী-সেতুটির পশ্চিমে আইডিয়াল স্কুলের পাশে, প্রায় ৮০০ মিটার দূরে। অন্যটি পূর্ব দিকে মেরাদিয়া বাজারের কাছে, প্রায় ৬০০ মিটার দূরে।
ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আইডিয়াল স্কুলের পাশে নির্মাণাধীন সেতুটির দৈর্ঘ্য ৩৮ মিটার এবং প্রস্থ ১৫ দশমিক ৪০ মিটার। মেরাদিয়া বাজারের কাছে নির্মাণাধীন সেতুটির দৈর্ঘ্য ৪৯ মিটার এবং প্রস্থ ১৫ দশমিক ৪০ মিটার। দুটি সেতুই যানবাহন চলাচলের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি পথচারীদের চলাচলের ব্যবস্থাও থাকবে।
বেগুনবাড়ী খালের ওপর তিনটি সেতু নির্মাণে ডিএনসিসির মোট ব্যয় হচ্ছে ৮৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। তিনটি সেতুই স্টিলের কাঠামো দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজ বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস।
ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, আইডিয়াল স্কুলের পাশের সেতুটির নির্মাণকাজ ৩৫ শতাংশ এবং মেরাদিয়া বাজারের পাশের সেতুটির কাজ ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে।
ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম জানান, পদচারী-সেতুটির নির্মাণকাজ গত মাসেই শেষ হয়েছে। তবে প্রশাসক দেশের বাইরে থাকায় তখন উদ্বোধন করা হয়নি। চিকিৎসা শেষে তিনি দেশে ফিরেছেন। আজ বিকেলে সেতুটি উদ্বোধনের পর সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
তিনটি সেতু নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো প্রগতি সরণিতে মেট্রোরেল লাইন-১ নির্মাণের সময় বিকল্প সড়ক তৈরি করা। ডিএনসিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, বসুন্ধরা-স্বদেশ প্রপার্টি-আফতাবনগর হয়ে বিকল্প পথে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হবে।
এর ফলে প্রগতি সরণির ওপর যানবাহনের চাপ কমার পাশাপাশি বনশ্রী ও আফতাবনগরের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হবে বলে আশা করছে ডিএনসিসি। ২০২৫ সালে এই তিন সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর সময়ও সংযোগ ও যানবাহন চলাচল সহজ করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তবে সেতু তিনটি চালু হলে বনশ্রী সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ডিএনসিসির করা একটি ট্রাফিক বিশ্লেষণে এমন সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
সেতু নির্মাণের আগে কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। পরে সেতু তিনটি চালু হলে যান চলাচলে এর সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে, তা জানতে প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিমুলেশন করে।
ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগ থেকে পাওয়া ওই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় প্রস্তাবিত চারটি বিকল্পের কোনোটিতেই যানবাহনের গড় বিলম্ব বা গড় যাত্রার সময় কমার সম্ভাবনা নেই। বরং সব কটি বিকল্পেই এই দুটি সূচকের অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। সামগ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাতেও উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রামপুরা থেকে বনশ্রী হয়ে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারমুখী করিডরে নতুন তিনটি সেতু চালু হলে ওই পথে যানবাহনের চাপ আরও বাড়তে পারে। এর ফলে যানজট, যানবাহনের বিলম্ব এবং যাত্রার সময় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে শুধু সেতু নির্মাণ করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না বলে মত দিয়েছে এমআইএসটি। সেতুগুলোর সঙ্গে সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়কের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর মোড় ব্যবস্থাপনার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ফলে নতুন পদচারী-সেতুটি স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন খাল পারাপারে স্বস্তি আনলেও, একই খালের ওপর নির্মাণাধীন যানবাহন চলাচলের দুই সেতু চালুর পর সামগ্রিক সড়ক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয় কি না, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।



