আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ফাইভারে সংঘবদ্ধভাবে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, ভুয়া অর্ডার ও রিভিউয়ের মাধ্যমে মার্কেটপ্লেসের র্যাংকিং প্রভাবিত করা এবং প্রতিযোগী ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশি প্রযুক্তি ও আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান বিটোপিয়ার বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি হাজার হাজার কর্মীর জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের তথ্য ব্যবহার করে ফাইভারে অ্যাকাউন্ট খুলে সেগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালনা করত। এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ভুয়া অর্ডার ও রিভিউয়ের মাধ্যমে মার্কেটপ্লেসে নিজেদের অবস্থান প্রভাবিত এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি কয়েকজন ফ্রিল্যান্সারের অভিযোগের পর গত জুলাইয়ের শেষ দিকে বিটোপিয়া-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০০টি ফাইভার অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েক হাজার অ্যাকাউন্ট তদন্ত ও নজরদারির আওতায় এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে ৪ আগস্ট ফাইভারের বাংলাদেশ অংশের কমিউনিটি ফোরামে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে নির্দিষ্ট করে বিটোপিয়ার নাম বা ৩০০টি অ্যাকাউন্টের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।
৪ আগস্ট ২০২৬ ফাইভারের কমিউনিটি ফোরামে ‘Ensuring fairness and integrity: an update on coordinated account manipulation’ শিরোনামে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অন্য ব্যক্তিদের হয়ে ফ্রিল্যান্সার অ্যাকাউন্ট তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কেটপ্লেসের সুনাম ও অবস্থান প্রভাবিত করতে ভুয়া রিভিউ ও অর্ডার ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ফাইভারের ওই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ও অর্ডার শনাক্ত করা হয়েছে। নীতিমালা লঙ্ঘনকারী অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কারসাজির মাধ্যমে অর্জিত সুবিধা কমানো এবং মার্কেটপ্লেসে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের অবস্থান নিচে নামানোর কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে এ ধরনের সংঘবদ্ধ কারসাজি শনাক্তে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা আরও উন্নত করার কথাও বলা হয়। বিটোপিয়ার নাম অবশ্য ওই বিজ্ঞপ্তিতে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
ফাইভারের প্রকাশিত বর্তমান নীতিমালায় একজন ব্যবহারকারীকে একটি অ্যাকাউন্ট রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নেওয়া, অন্য ব্যবহারকারীকে বিভ্রান্ত করা বা প্ল্যাটফর্মের সিস্টেম প্রভাবিত করাকে নীতিমালা লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য ব্যক্তির পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তার নামে অ্যাকাউন্ট তৈরি করাও নিষিদ্ধ। এ ধরনের লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে স্থগিত হতে পারে।
ফাইভার আরও বলেছে, ভুয়া বা কৃত্রিমভাবে বাড়ানো রিভিউ এবং প্রকৃত সেবা গ্রহণের উদ্দেশ্য ছাড়া অর্ডার করে রেটিং বাড়ানোর চেষ্টা নিষিদ্ধ। প্ল্যাটফর্মটির নীতিমালা অনুযায়ী, একাধিক অ্যাকাউন্ট বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে ফিডব্যাক বাড়ানোর চেষ্টাও শাস্তিযোগ্য।
বিটোপিয়ার বিরুদ্ধে ভুয়া অর্ডার ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের গিগের র্যাংকিং ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগও রয়েছে। এ বিষয়ে ফ্রিল্যান্সার এম এন নাহিদের একটি অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে। একটি প্রতিবেদনে তাঁর অভিযোগের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বিটোপিয়া-সংশ্লিষ্ট একটি অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁর ফাইভার গিগে অর্ডার দিয়ে পরে তা বাতিল করা হয়েছিল। অভিযোগটি ঘিরে বিটোপিয়া বিষয়টি অস্বীকার করে এবং নাহিদের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি করার কথাও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে বিটোপিয়ার এক সাবেক কর্মীর বক্তব্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে। তাঁর দাবি, প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং নিজেদের গিগের র্যাংকিং বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ভুয়া অর্ডারের কৌশল ব্যবহার করা হতো। এসব বক্তব্য ও অভিযোগ স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো আদালতের রায় বা সরকারি তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিটোপিয়ার পাঁচ হাজারের বেশি কর্মীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের তথ্য ব্যবহার করে কর্মীদের ব্যক্তিগত নামে ফাইভার অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অ্যাকাউন্ট সংশ্লিষ্ট কর্মীরা নিজেরা পরিচালনা না করে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার অধীনে পরিচালিত হতো।
সাবেক কর্মীদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, চাকরি ছাড়ার পরও নিজেদের নামে খোলা বা ব্যবহৃত ফাইভার প্রোফাইলের নিয়ন্ত্রণ তারা ফিরে পাননি। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট সব কর্মীর বক্তব্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
এদিকে বিটোপিয়া-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলারের কাজ বাতিল করা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এই দাবির স্বাধীন ও সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
ফাইভারে অ্যাকাউন্ট পরিচালনার অভিযোগের পাশাপাশি বিটোপিয়া গ্রুপের বিরুদ্ধে সাবেক কর্মীদের কাছ থেকে পাসপোর্ট আটকে রাখা, চাকরি ছাড়তে গেলে মামলা বা হয়রানির ভয় দেখানো, অনিয়মিত বেতন, অতিরিক্ত সময় কাজ করানো এবং কর্মী ছাঁটাইসহ বিভিন্ন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব অভিযোগও স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত নয় এবং প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী বক্তব্য রয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়।
প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা ও বেতনকাঠামো নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, স্বাস্থ্যবিমা ও উৎসব ভাতার মতো কর্মিসুবিধা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই। এসব অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
২০১৭ সালে পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ ও সাতজন কর্মী নিয়ে বিডিকলিং আইটি নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে এর পরিসর বাড়িয়ে বিটোপিয়া গ্রুপ গড়ে ওঠে। ২০২৬ সালের একটি করপোরেট প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনির হোসেনকে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিটোপিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনির হোসেনের একটি বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছে। ১৮ আগস্ট তিনি প্রতিবেদককে ফোন করে আলোচনার জন্য দেখা করার কথা বলেন। পরে তাঁকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, তাঁর ভাষায়, তিনি ফাইভারভিত্তিক ব্যবসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন এবং তাঁর ‘অনেক আইডি’ ফাইভারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্যে অভিযোগগুলোর বিস্তারিত খণ্ডন বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্ট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সাধারণ সম্পাদক ফায়সাল আলিমও এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি ফ্রিল্যান্সারদের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতকে সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কথা বলেন।
বাংলাদেশের একজন অভিজ্ঞ ফ্রিল্যান্সার অভিযোগগুলোর বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি করেছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রকৃত ফ্রিল্যান্সারদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও ব্যবসায়িক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাঁর ভাষ্য, কয়েকটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অর্ডার বাতিলের কারণে একজন ফ্রিল্যান্সারের গিগের র্যাংকিং ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
বিষয়টি বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক ফ্রিল্যান্সার আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে নিজেদের পরিচয়ে বৈধভাবে কাজ করেন। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অ্যাকাউন্ট পরিচালনা বা মার্কেটপ্লেস কারসাজির অভিযোগ উঠলে এর প্রভাব অন্য বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের অ্যাকাউন্ট যাচাই ও প্ল্যাটফর্মের নজরদারিতেও পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রভাব পুরো বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাত বা বৈধ ফ্রিল্যান্সারদের ওপর কীভাবে পড়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান বা ফাইভারের আনুষ্ঠানিক তথ্য এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই এ পর্যায়ে বিষয়টিকে অভিযোগ ও চলমান তদন্তের পরিধিতেই দেখা হচ্ছে।
ফাইভারের নিজস্ব নীতিমালায় অবশ্য একাধিক অ্যাকাউন্ট, ভুয়া পরিচয়, অন্যের হয়ে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, ভুয়া রিভিউ এবং র্যাংকিং কারসাজিকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে বিটোপিয়াকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট, অর্ডার, পরিচয় যাচাই এবং প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে আরও তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



