বাংলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ছড়াকার, লেখক ও সাংবাদিক আখতার হুসেন আর নেই। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও তাঁর দুই ছেলে পান্থ ও প্রমিত তাঁর মৃত্যুর খবর জানিয়েছেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তিনি দীর্ঘদিন ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। সর্বশেষ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ও রক্তচাপ কমে যাওয়াসহ নানা শারীরিক জটিলতায় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত শুক্রবার থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে তাঁকে রাজধানীর ফার্মগেটের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে বারডেম হাসপাতাল ও গ্রিন লাইফ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সর্বশেষ তাঁকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়েছিল।
১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আখতার হুসেন। প্রায় ছয় দশক ধরে তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়া, গল্প, গান ও বিভিন্ন ধরনের সাহিত্য রচনা করেছেন। তাঁর লেখা সহজ, প্রাণবন্ত ছড়া বহু শিশুর পাঠাভ্যাস ও শৈশবের সঙ্গে মিশে আছে। তাঁর বেশ কিছু লেখা পাঠ্যপুস্তকেও স্থান পেয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর লেখনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা’ গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিচিতি পায়। গানটির সুর করেছিলেন অজিত রায় এবং কণ্ঠ দিয়েছিলেন তিমির নন্দী।
আখতার হুসেনের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। শিশু-কিশোরদের জন্য মৌলিক রচনার পাশাপাশি জীবনী, অনুবাদ ও সম্পাদিত গ্রন্থও রয়েছে তাঁর। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’ এবং ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এও তিনি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক লেখা দেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। বাংলা একাডেমির পুরস্কারের পাশাপাশি আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পুরস্কার, ভাষা শহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদক, মুক্তিযোদ্ধা কলম সৈনিক সম্মাননা স্মারক, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ও বজলুর রহমান স্মৃতিপদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি বাংলা একাডেমির ফেলোও ছিলেন।
পেশাগত জীবনে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আখতার হুসেন। তিনি দৈনিক জনকণ্ঠ, প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে কাজ করেছেন। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রথমা প্রকাশনে পাণ্ডুলিপি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও উদীচীর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন তিনি।
সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিচারণে আখতার হুসেনের সরল জীবনযাপন, আন্তরিকতা ও শিশুসুলভ প্রাণবন্ততার কথা উঠে এসেছে। তাঁর ছড়ার মতোই সহজ-সরল ও স্বাভাবিক ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব। খ্যাতি অর্জন করলেও তা নিয়ে অহংকার ছিল না বলে তাঁকে কাছ থেকে জানা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে পান্থ ও প্রমিতসহ অসংখ্য স্বজন, সহকর্মী, পাঠক ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর জানাজা ও দাফনের স্থান-সময় পরে জানানো হবে বলে পরিবার জানিয়েছে।
শিশু-কিশোরদের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে সৃষ্টিশীল কাজ করে যাওয়া আখতার হুসেনের মৃত্যুতে বাংলা শিশুসাহিত্য অঙ্গনে শোক নেমে এসেছে। তাঁর লেখা ছড়া, গল্প, গান ও অন্যান্য সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি পাঠকদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।



