গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩ হাজার ৩২৩ জন চিকিৎসককে বদলি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি মেডিকেল অফিসার। বদলি হওয়া চিকিৎসকদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে ঢাকা ও আশপাশের জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে পদায়ন করা হয়েছে। তবে এসব বদলির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা ও প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন চিকিৎসক। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, চিকিৎসক সংকট মোকাবিলা ও জনবল সমন্বয়ের অংশ হিসেবেই এসব বদলি করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই বদলিগুলো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ১১ মার্চ মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেন। একই সময়ে পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পান অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দীন মোহাম্মদ রুমী।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী, চিকিৎসকদের বদলি তিনটি ক্যাটাগরিতে কার্যকর হয়। এর মধ্যে পার-২ ক্যাটাগরিতে রয়েছেন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রভাষক, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও), আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) এবং ষষ্ঠ গ্রেডের চিকিৎসকেরা।
গত ছয় মাসে পার-২ ক্যাটাগরিতে ৭২০ জন চিকিৎসক বদলি হয়েছেন।
অন্যদিকে পার-৩ ও পার-৪ ক্যাটাগরিতে রয়েছেন মেডিকেল অফিসার, সহকারী রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন পদের চিকিৎসক। এই দুই ক্যাটাগরি মিলিয়ে বদলি হয়েছেন ২ হাজার ৬০৩ জন। তাদের বেশিরভাগই মেডিকেল অফিসার।
তিন ক্যাটাগরি মিলিয়ে গত ছয় মাসে মোট ৩ হাজার ৩২৩ জন চিকিৎসকের বদলি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বদলি হওয়া চিকিৎসকদের প্রায় ২ হাজার ২০০ জনকে ঢাকা মহানগরী ও আশপাশের জেলার হাসপাতালগুলোতে পদায়ন করা হয়েছে। বাকিদের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সরেজমিনে গিয়ে পদায়ন নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের ভিড়ের চিত্রও দেখা গেছে। পরিচালকের (প্রশাসন) কক্ষের সামনে প্রতিদিনই অনেক চিকিৎসককে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাদের কেউ রাজনৈতিক দলের নেতা, চিকিৎসক সংগঠনের প্রতিনিধি কিংবা সাবেক ও জ্যেষ্ঠ আমলাদের সুপারিশ নিয়ে আসছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বরগুনার একটি উপজেলা হাসপাতালে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন ডা. মাহফুজুর রহমান (ছদ্মনাম)। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পদায়ন করা হয়। তার স্ত্রী ঢাকার একটি উচ্চমাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হওয়ায় এই পদায়ন তার জন্য সুবিধাজনক ছিল। তবে চলতি বছরের আগস্টে তাকে আবার বদলি করে ফরিদপুরে পাঠানো হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের স্পাইন সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শহীদুল ইসলাম আকনের ক্ষেত্রেও বদলির ঘটনা আলোচনায় এসেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় গুলিবিদ্ধ আহতদের জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার পর চলতি বছরের এপ্রিলে তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে বদলি করা হয়। এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ঢাকা মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন।
আরেক চিকিৎসক ডা. তমাল আহমেদ (ছদ্মনাম) দাবি করেন, বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও রাজনৈতিক কারণে তিনি পাঁচ বছর গেজেটভুক্ত হতে পারেননি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর গেজেটভুক্ত হয়ে প্রথমে সিরাজগঞ্জের একটি উপজেলায় পদায়ন পান। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এক মাসের ব্যবধানে তাকে দুই দফায় সিরাজগঞ্জে বদলি করা হয়।
ডা. তমাল আহমেদ বলেন, ‘পতিত সরকারের সময়ে বৈষম্যের শিকার হয়ে যোগদান করতে পারিনি। আর এখন শুধু রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে এক মাসের ব্যবধানে দুবার ঢাকার বাইরে পাঠানো হলো।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পদায়ন পাওয়া ডা. মেহেদী হাসানও বদলির অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, চার মাসের মাথায় তাকে ‘জামায়াত ট্যাগ’ দিয়ে গাজীপুরে বদলি করা হয়।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ডা. হাবিবুর রহমানকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে ঢাকা থেকে রাজশাহীর একটি উপজেলা হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা এসব ঘটনাকে পেশাগত হয়রানি হিসেবে দেখছেন।
ময়মনসিংহের একটি উপজেলায় সাত বছর ধরে কর্মরত ডা. রোকসানা আঞ্জুম ঢাকায় পদায়নের আশায় তার শ্বশুর, ১৯৮৩ ব্যাচের একজন অবসরপ্রাপ্ত আমলাকে নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকায় নিজে এসেছিলাম। শ্বশুরকে এনেও কাজ হলো না, খালি হাতে ফেরত যেতে হচ্ছে।’
সামগ্রিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দীন মোহাম্মদ রুমী বলেন, ‘নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সরকার যাকে যেখানে ভালো মনে করবে, তাকে সেখানে বদলি ও পদায়ন করা হবে। এটাই নিয়ম। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’ তার এই বক্তব্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বদলি-পদায়নসংক্রান্ত একাধিক প্রশাসনিক আদেশের তথ্যও মেলে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, এসব বদলি নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রমের অংশ। গুরুত্বপূর্ণ পদে হয়তো দু-একটি বদলির ঘটনা ঘটেছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কোনো বদলি হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকদের বদলি নিয়ে তিনি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছিলেন।
চিকিৎসক সংকটের কারণে বদলি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি বলেন, যেসব এলাকায় তুলনামূলক বেশি চিকিৎসক রয়েছেন, সেখান থেকে চিকিৎসক এনে সংকটপূর্ণ এলাকায় পদায়নের মাধ্যমে জনবল সমতা আনার চেষ্টা চলছে। চিকিৎসকদের নিজ জেলা বা বিভাগের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হলেও সব ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয় না।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চিকিৎসকদের দূরে বদলি করা হচ্ছে—এমন দাবির বিষয়ে ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাউকে দূরে বদলি করা হয়েছে বলে তার মনে হয় না। তবে দীর্ঘদিন একই স্থানে থাকা চিকিৎসকদের নিয়ম অনুযায়ী অন্যত্র বদলি করা হলে তা নিয়ে নানা কথা উঠতে পারে এবং দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরও জানান, চলমান প্রায় পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ হলে চিকিৎসক সংকট অনেকটাই কমে আসবে। এ নিয়োগের বিষয়ে সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) কাজ করছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও আবেদনের সময়সীমাসহ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি।



