পরীক্ষামূলক সংস্করণ

ডলারের নির্ভরতা কমাতে স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে চীন

মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে চীন। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সঞ্চয়ের মূল্য ধরে রাখতে দেশটির সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও স্বর্ণ কেনার প্রবণতা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারাবাহিক স্বর্ণ কেনা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ঝুঁকি কমানো এবং সম্পদে বৈচিত্র্য আনার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়না (পিবিওসি) সেপ্টেম্বরে টানা ২৩তম মাসের মতো স্বর্ণ কিনেছে। ওই মাসে প্রায় তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ কেনে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টভিত্তিক কমার্জব্যাংকের পণ্য গবেষণা বিভাগের প্রধান থু ল্যান নগুয়েনের মতে, চীনের স্বর্ণ কেনার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণপত্রের ওপর নির্ভরতা কমানো। মার্কিন সরকারি ঋণপত্র ‘ট্রেজারি’ নামে পরিচিত।

চীনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি বড় অংশ ডলারভিত্তিক সম্পদে বিনিয়োগ করা রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত, নিষেধাজ্ঞা কিংবা আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে এসব সম্পদ ব্যবহারে বাধা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

নগুয়েনের ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের স্বর্ণ কেনা রিজার্ভকে আরও স্থিতিশীল করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। তাঁর মতে, দেশের ভেতরে রাখা স্বর্ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, এটি অন্য কোনো দেশের দায় বা প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভরশীল নয়। ফলে বিদেশি সরকারের নিষেধাজ্ঞা কিংবা সম্পদ জব্দের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।

রাশিয়ার সম্পদ জব্দের ঘটনা থেকে শিক্ষা

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর পশ্চিমা দেশগুলো বিদেশে রাখা রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করে। এ ঘটনা দেখিয়েছে, অন্য দেশে রাখা বৈদেশিক রিজার্ভ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে ব্যবহার-অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।

চীনের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হলে বিদেশে রাখা দেশটির সম্পদের কিছু অংশও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে। এ কারণে স্বর্ণের মজুত বাড়িয়ে রিজার্ভের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে বেইজিং।

তবে স্বর্ণ কেনার অর্থ এই নয় যে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সব সরকারি ঋণপত্র বিক্রি করে দিচ্ছে। বরং ডলারভিত্তিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে রিজার্ভের বিভিন্ন সম্পদের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে দেশটি।

যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নিয়েও উদ্বেগ

চীনের স্বর্ণ কেনার আরেকটি প্রেক্ষাপট হলো যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

মার্কিন কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের ফেব্রুয়ারির পূর্বাভাস অনুযায়ী, জনগণের হাতে থাকা ফেডারেল ঋণের পরিমাণ ২০২৬ সালে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩৬ সালে ১২০ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। চীনের হাতে থাকা মার্কিন সরকারি ঋণপত্রের বিষয়টিও এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণ চীনাদের মধ্যেও বাড়ছে স্বর্ণ কেনা

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি চীনের সাধারণ মানুষের মধ্যেও স্বর্ণ কেনার প্রবণতা বাড়ছে। তবে তাঁদের উদ্দেশ্য বেইজিংয়ের কৌশলগত লক্ষ্য থেকে আলাদা। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মূলত সঞ্চয়ের মূল্য ধরে রাখা এবং বিকল্প বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণকে বেছে নিচ্ছেন।

চায়না গোল্ড অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনে স্বর্ণের বার ও মুদ্রা কেনার পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।

কমার্জব্যাংকের বিশ্লেষক নগুয়েনের মতে, স্বর্ণের শক্তিশালী চাহিদা আংশিকভাবে সঞ্চয়ের বিকল্প মাধ্যম খোঁজার প্রবণতার প্রতিফলন।

চীনের শেয়ারবাজারের দুর্বলতা এবং আবাসন খাতের সংকটও স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। অতিরিক্ত ঋণ ও অতিরিক্ত নির্মাণের কারণে দেশটির আবাসন খাতে চাপ তৈরি হয়েছে এবং বাড়ির দাম কমেছে। ফলে অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে আবাসন আগের মতো আকর্ষণীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।

দাম কমলেও স্বর্ণে আগ্রহ অব্যাহত

চাহিদা বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের দাম কমেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবরে স্বর্ণের দাম প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, শক্তিশালী মার্কিন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণপত্রের উচ্চ মুনাফা স্বর্ণের দাম কমার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। সুদ দেয় এমন সম্পদের মুনাফা বাড়লে বিনিয়োগকারীদের কাছে সেগুলোর আকর্ষণ বাড়তে পারে। বিপরীতে, স্বর্ণ থেকে নিয়মিত সুদ বা লভ্যাংশ পাওয়া যায় না।

তবে দাম কমার পরও চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণ কেনার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। এতে বোঝা যায়, তাঁদের আগ্রহ কেবল স্বল্পমেয়াদি দামের ওঠানামার ওপর নির্ভর করছে না; দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বরে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ২৩ টন স্বর্ণ মজুত করেছে। এতে দেশটির ঘোষিত স্বর্ণের মজুত বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৪১০ টনে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর এটিই ছিল চীনের সবচেয়ে বড় মাসিক স্বর্ণ কেনার পরিমাণ।

সেপ্টেম্বরের শেষে চীনের মোট সরকারি রিজার্ভের ৮ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল স্বর্ণ। ২০২৪ সালের শেষে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশটির সরকারি রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ ক্রমেই বাড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক লেনদেন পরিচালনা এবং আর্থিক সংকট মোকাবিলায় বৈদেশিক মুদ্রা, বিদেশি সরকারের ঋণপত্র ও স্বর্ণের মতো সম্পদ রিজার্ভ হিসেবে সংরক্ষণ করে। চীন এখন এসব সম্পদের মধ্যে স্বর্ণের অংশ বাড়িয়ে রিজার্ভকে আরও বৈচিত্র্যময় করার পাশাপাশি ডলারনির্ভরতা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে।

প্রধান খবর

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য অটুট রাখতে হবে: রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দুর্গাপূজা উপলক্ষে তিনি রমনা কালীমন্দির পরিদর্শন করেন।

দুর্নীতির মামলায় কাতারে গ্রেপ্তার সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান

দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মামলায় কাতারে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান শেখ আব্দুল হান্নান। তাঁর ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

নেত্রকোনায় আবারও যুবককে গুলি

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে রামকৃষ্ণ মন্দিরের পাশে সুজন পাল নামে এক যুবককে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। তাঁকে উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

আসছে...