অল ক্রাইমস. টিভি ডেস্ক
তিন বছর ধরে চলা সুদান-এর গৃহযুদ্ধ এখন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে, সংঘাত শুধু দীর্ঘায়িতই হচ্ছে না, বরং প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। রাজধানী খার্তুম থেকে দারফুর পর্যন্ত বিস্তৃত এই যুদ্ধ দেশটিকে ধীরে ধীরে এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ বৈশ্বিক মনোযোগ এখন ইউক্রেন, ইরান বা গাজাকেন্দ্রিক হওয়ায় সুদানের এই গভীর সংকট অনেকটাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় দেড় লাখ প্রাণহানির কথা বলা হলেও, অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা এ সংখ্যা চার লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে এল ফাশের অঞ্চলে সংঘটিত সহিংসতার প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি সামনে আসেনি। উপগ্রহচিত্রে বিস্তীর্ণ এলাকায় মৃত্যুর ভয়াবহতা স্পষ্ট হলেও নির্ভুল পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই সংঘাতে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ড্রোন হামলা, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জনবহুল এলাকায় চালানো এসব হামলায় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। পাশাপাশি যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে, বিশেষ করে আধাসামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতনের বহু প্রমাণ মিলেছে।
যুদ্ধের পাশাপাশি দেশটি এখন চরম খাদ্য সংকটে নিমজ্জিত। জনসংখ্যার বড় অংশ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং কিছু এলাকায় ইতোমধ্যেই দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। এক সময় কৃষিতে সমৃদ্ধ এই দেশ যুদ্ধের কারণে আবাদ হারিয়ে ফেলেছে, আর ত্রাণ পৌঁছাতেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অপুষ্টি ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে সাধারণ রোগও মারাত্মক আকার ধারণ করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করছে, দ্রুত ত্রাণ না পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থাও প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। বহু হাসপাতাল ও ক্লিনিক অকার্যকর, এমনকি চিকিৎসাধীন রোগীরাও নিরাপদ নন। সাম্প্রতিক এক হামলায় একটি হাসপাতালে বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
এদিকে এই গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করেছে বিশ্বের অন্যতম বড় বাস্তুচ্যুত সংকট। লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী শিবিরে বা প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। এতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়েছে, কারণ সীমান্তবর্তী দেশগুলো এত বিপুল মানুষের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন এই সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করছে। অস্ত্র ও অর্থের জোগান অব্যাহত থাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পর্যাপ্ত মনোযোগ ও তহবিলের অভাবে মানবিক সহায়তাও কমে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে দ্রুত কার্যকর যুদ্ধবিরতি ও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া সংকট নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। তা না হলে এই সংঘাত শুধু সুদান-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।



