মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম দ্রুত বাড়ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিলে দেশটিতে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ১ হাজার পাকিস্তানি রুপিতে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক। তাঁর দাবি, বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
এই সতর্কবার্তা আসে এমন সময়ে, যখন ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে পাকিস্তানে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম নির্ধারিত হয়েছিল ৩৮৯ দশমিক ১৪ পাকিস্তানি রুপি। ওই সময় উচ্চগতির ডিজেলের দাম ছিল ৪২৪ দশমিক ০৪ রুপি।
তবে জ্বালানির দাম স্থির থাকেনি। ২২ সেপ্টেম্বর পেট্রোলের দাম আবার বেড়ে ৩৯৩ দশমিক ৭৫ রুপিতে ওঠে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ খুচরা দামও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
কখন পেট্রোলের দাম বাড়ল
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম বাড়তে শুরু করে। ১ মার্চ প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ছিল ২৬৬ দশমিক ১৭ পাকিস্তানি রুপি। ৭ মার্চ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২১ দশমিক ১৭ রুপিতে।
এপ্রিলের শুরুতে দাম আরও বড়ভাবে বাড়ে। ৩ এপ্রিল সরকার দাম ৪ শতাংশের বেশি বাড়ানোর পর প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ৪৫৮ দশমিক ৪১ রুপিতে পৌঁছায়।
এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমতে থাকলে পাকিস্তানেও পেট্রোলের দাম কমে। ২০ জুন প্রতি লিটারের দাম নেমে আসে ২৯৯ দশমিক ৫০ রুপিতে।
তবে পরবর্তী সময়ে আবার দাম বাড়তে শুরু করে। ১৯ সেপ্টেম্বর পেট্রোলের দাম সামান্য কমে ৩৮৯ দশমিক ১৪ রুপিতে নির্ধারিত হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তা আবার বেড়ে যায়। ২২ সেপ্টেম্বরের হিসাবে দাম দাঁড়ায় ৩৯৩ দশমিক ৭৫ রুপি।
পাকিস্তানের অয়েল অ্যান্ড গ্যাস রেগুলেটরি অথরিটি (ওজিআরএ) আন্তর্জাতিক বাজারের জ্বালানির দাম, প্রিমিয়াম ও অন্যান্য মূল্য নির্ধারণের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দাম নির্ধারণ করে।
পেট্রোলের দাম বাড়ার কারণ
পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এর অন্যতম কারণ, দেশটি তার চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করতে আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানির ওপর নির্ভর করে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে, অর্থাৎ জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত পাকিস্তান ৫৩ লাখ ৫০ হাজার টন মোটর স্পিরিট বা পেট্রোল আমদানি করেছে। একই সময়ে দেশটির স্থানীয় তেল শোধনাগারগুলো প্রায় ২৬ লাখ ৩০ হাজার টন পেট্রোল সরবরাহ করে। তেল বিপণন কোম্পানিগুলো বা ওএমসিগুলো প্রায় ৭৬ লাখ ৮০ হাজার টন পেট্রোল বিক্রি করে।
আমদানি করা পেট্রোলের পরিমাণ ওএমসিগুলোর মোট পেট্রোল বিক্রির প্রায় ৬৯ দশমিক ৭ শতাংশের সমান। তবে সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায় থেকে সংগৃহীত এসব পরিসংখ্যানকে দেশের মোট পেট্রোল সরবরাহের ১০০ শতাংশের সরাসরি বিভাজন হিসেবে দেখা উচিত নয়।
আমদানি খরচ থেকে পাম্পের দাম
পাম্পে বিক্রি হওয়া পেট্রোলের দামের মধ্যে শুধু আমদানি করা জ্বালানির মূল্য থাকে না। এর সঙ্গে আমদানি ও পরিবহন ব্যয়, বিপণন কোম্পানি ও ডিলারের কমিশন এবং বিভিন্ন সরকারি কর ও লেভিও যুক্ত হয়।
১৯ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর দামের হিসাবে, শুল্কসহ পেট্রোলের আমদানি ও শোধনাগার পর্যায়ের দাম ছিল প্রতি লিটার ২৭৮ দশমিক ৫৮ পাকিস্তানি রুপি।
এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ পরিবহন সমন্বয় মার্জিন হিসেবে ৭ দশমিক ৭১ রুপি, তেল বিপণন কোম্পানির মার্জিন ৭ দশমিক ৮৭ রুপি এবং ডিলার কমিশন ৯ দশমিক ৯৮ রুপি যোগ হয়।
এ ছাড়া পেট্রোলিয়াম লেভি হিসেবে ৮০ রুপি এবং ক্লাইমেট সাপোর্ট লেভি হিসেবে আরও ৫ রুপি যোগ করা হয়। সব মিলিয়ে পাম্পে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম দাঁড়ায় ৩৮৯ দশমিক ১৪ পাকিস্তানি রুপি।
পাকিস্তানি রুপির বিনিময় হারও আমদানি ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। ডলারে মূল্য নির্ধারিত জ্বালানি আমদানি করতে রুপির বিনিময়মূল্য দুর্বল হলে একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে বেশি স্থানীয় মুদ্রা ব্যয় করতে হয়।
২২ সেপ্টেম্বরের হিসাবে ১ মার্কিন ডলারের মূল্য ছিল প্রায় ২৭৭ দশমিক ২১ পাকিস্তানি রুপি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি বিনিময় হারও আমদানি ব্যয়কে প্রভাবিত করছে।
পাকিস্তানে ভোক্তারা পাম্পে যে দামে পেট্রোল কেনেন, তা নির্ধারণে তাই কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত পেট্রোলের দাম, আমদানি ও পরিবহন ব্যয়, প্রিমিয়াম, সরকারি লেভি, কর এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে পাকিস্তানি রুপির বিনিময় হার।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় পাকিস্তান সরকার জ্বালানি সংরক্ষণে বিভিন্ন পদক্ষেপও নিয়েছে। সরকারি যানবাহনের জ্বালানি বরাদ্দ কমানো, নতুন সরকারি গাড়ি কেনায় বিধিনিষেধ এবং সরকারি ব্যয় কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক বলেছেন, জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে এবং তখন প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ১ হাজার পাকিস্তানি রুপি পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। তবে এটি বর্তমান নির্ধারিত দাম নয়, সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের ক্ষেত্রে তাঁর দেওয়া সতর্কতা।



