কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যাসহ নিখোঁজ রয়েছেন যশোরের মণিরামপুরের বাসিন্দা নাহিদুর রহমান (৪১)। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে পাটোয়ারটেক এলাকায় অবস্থিত রিসোর্টটিতে আগুন লাগার পর থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না স্বজনেরা। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে নাহিদুর ও তার পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিখোঁজ নাহিদুরের স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানা (৩)। পরিবারের সদস্যদের দাবি, অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। সবার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে তারা বেঁচে আছেন, নাকি অগ্নিকাণ্ডে হতাহত হয়েছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না স্বজনেরা।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ইনানীর ওই রিসোর্টে থাকার জন্য কক্ষ বুক করেছিলেন নাহিদুর। রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুর ১টায় তাদের চেকআউট করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগেই আগুনে পুড়ে যায় রিসোর্টটি।
নাহিদুর ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। তিনি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর মিরপুরের শ্যাওড়াপাড়ায় বসবাস করতেন তিনি।
নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স মণিরামপুর পৌরশহরে বসবাস করেন। তিনি জানান, শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) নাহিদুর তাদের কক্সবাজার যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। শনিবার সকালে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু নাহিদুর ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের মুঠোফোন বন্ধ পান।
জাহিদুর রহমান বলেন, নাহিদুর ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত কক্সবাজারের ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে একটি কক্ষ বুকিং দিয়েছিলেন। ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টায় তাদের রিসোর্ট ছাড়ার কথা ছিল। অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকে ভাই ও তার পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এখন পর্যন্ত তাদের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি।
তিনি আরও বলেন, তারা দুই ভাই। মা নেই, অসুস্থ বাবা গ্রামে তাদের সঙ্গে থাকেন। নাহিদুরের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি এখনো বাবাকে জানানো হয়নি। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় থাকতেন নাহিদুর। ছুটি বা উৎসবের সময় গ্রামে আসতেন। পরিবারের সদস্যরা তার ও স্ত্রী-সন্তানদের খোঁজ না পেয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। আগুনে মরদেহগুলোর মুখমণ্ডল পুড়ে যাওয়ায় প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বজনদের দাবির ভিত্তিতে কয়েকটি মরদেহের সম্ভাব্য পরিচয় নির্ধারণ করা হলেও সেগুলোর চূড়ান্ত পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ফিরোজ কবির জানান, ১০টি মরদেহের দাবিদার হিসেবে একাধিক পরিবার সামনে এসেছে। মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে দাবিদার পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহগুলো সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
অন্যদিকে, কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান শনিবার বিকেলেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে মরদেহগুলো পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ উদ্ধার হওয়া চারজনের মধ্যে দুটি শিশু ছিল বলেও জানান তিনি।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টটির ছয়টি কক্ষে ১৬ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়জন সকালে বেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন বলে জানা গেছে।
রিসোর্টটিতে অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না বলেও জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। রিসোর্টটির নিচতলায় রান্নাঘর এবং ওপরের অংশে আবাসিক ব্যবস্থা ছিল। রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের সম্ভাব্য পরিচয়ের তালিকায় রয়েছেন ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মেলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), ফারিয়া কবির (৩৩), পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ, ঢাকার সাভারের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. নাফিস তেহামী, জিহাদ হাওলাদার ও তারিকুল ইসলাম।
তবে তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় এবং নিখোঁজ নাহিদুরের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মরদেহগুলোর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা হবে। ফলে নাহিদুর, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের সন্ধানে এখন পরীক্ষার ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনেরা।



