ফ্রান্সের লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক সিটি হলে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কট্টর বামপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দেশজুড়ে সহিংস বিক্ষোভের মধ্যে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তির বয়স প্রায় ৪০ বছর। তবে তাঁর নাম-পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনি কট্টর বামপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং অতীতে সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর সহিংসতার অভিযোগে নজরদারির তালিকায় ছিলেন। ফ্রান্সে ‘এস’ শ্রেণিভুক্ত তালিকায় এমন ব্যক্তিদের রাখা হয়, যাঁদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) লিমোজ শহরের ১৯ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক সিটি হলে আগুন দেওয়া হয়। এতে ভবনটির ছাদ ও ঘড়ির মিনার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে ঘটে। অগ্নিসংযোগের ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি জড়িত ছিলেন কি না, তা তদন্ত করে দেখছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের একপর্যায়ে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। প্যারিস, মার্সেই, বোর্দো, নিস, লিওঁ ও লিলেসহ বিভিন্ন শহরে সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হামলার শিকার হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি এলাকায় সান্ধ্য আইন ও চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
ফরাসি বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিন সরকারি কৌঁসুলিদের কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ, জেন্ডারমেস ও অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের ওপর হামলা, দোকানপাটে লুটপাট এবং সরকারি ভবনে আক্রমণের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারির প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেছেন বিচারমন্ত্রী। তাঁর মতে, এমন পদক্ষেপ নাগরিকদের ব্যক্তিস্বাধীনতা সীমিত করতে পারে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকরনু জরুরি অবস্থা জারির সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। সোমবার থেকে বিভিন্ন এলাকায় সান্ধ্য আইন ও অন্যান্য বিধিনিষেধ কার্যকর করার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার রাতেও এসব বিধিনিষেধ বহাল থাকবে কি না, তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্ধারণ করা হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লেকরনু জানান, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও মেয়ররা নিজ নিজ এলাকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর লিওঁসহ কয়েকটি এলাকায় রাতের পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল বলে খবর পাওয়া গেছে।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ স্বীকার করেন, বিক্ষোভের সময় কয়েকটি শহরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। নিরাপত্তা প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে সমালোচনার মধ্যে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিলেও প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ তা প্রত্যাখ্যান করেন।
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়েছে। প্রায় এক হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেস সদস্য আহত হয়েছেন। পুলিশের ব্যবহৃত ভিড় নিয়ন্ত্রণের গ্রেনেডের বিস্ফোরণে এক বিক্ষোভকারীর হাত গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ফ্রান্সে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও সেবার মান উন্নয়নের দাবিতে। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। ট্রেড ইউনিয়ন ও বিভিন্ন প্রতিবাদী গোষ্ঠী এতে যুক্ত হলে বিক্ষোভের পরিসর বাড়ে।
ফ্রান্সের চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রধানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতায় দুই হাজারের বেশি দোকান ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন শহরে মুখোশধারী ব্যক্তিদের গাড়ি ও ভবনে আগুন দিতে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালাতে দেখা গেছে।
বিক্ষোভের আয়োজকেরা আগামী শনিবার ফ্রান্সজুড়ে দ্বিতীয় দফার প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং চলমান সামাজিক অসন্তোষ মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।



