অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক
সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় মৌসুমের সর্বোচ্চ ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওর ও নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে জমির পাকা ধান তলিয়ে যাচ্ছে। সোমবার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত এই বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। পানির চাপে ইতোমধ্যে দুটি উপজেলায় দুটি ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে গেছে, যার ফলে আরও ফসলহানির ঘটনা ঘটেছে।
মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের চান্দালীপাড়া গ্রামে ইকরাছই হাওরের একটি বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে ফসল তলিয়ে গেছে। একইভাবে দেখার হাওরের গুজাউনি বাঁধ পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। এই দুটি বাঁধই স্থানীয়ভাবে নির্মিত, পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাভুক্ত নয়। এছাড়া বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরের হরিমণের বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করছিল, যেখানে সকাল থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবস্থান করছিলেন, যদিও বাঁধটির কাজ গত বছর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্পন্ন হয়নি।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে ১৩৭টি হাওরে মোট দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৯৯ হাজার ৪৮৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, যা মোট আবাদি জমির প্রায় ৪৪ শতাংশ। বাকি অর্ধেকেরও বেশি জমির ধান এখনো কাটার বাকি রয়েছে, যা বর্তমানে প্রাকৃতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, বজ্রপাতের আশঙ্কা এবং শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকেরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। অনেক হাওরে আগে থেকেই জলাবদ্ধতা থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বৃষ্টির কারণে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ ব্যাহত হচ্ছে। হাওরে পানি জমে থাকায় অনেক স্থানে হারভেস্টার মেশিনও ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
জগন্নাথপুর উপজেলার দাসনোয়াগাঁও গ্রামের ৬০ বছর বয়সী কৃষক সারদা চরণ দাস জানান, তার ১৬ বিঘা জমির মধ্যে মাত্র চার বিঘা জমির ধান কাটতে পেরেছেন, বাকি ধান রাতের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে। দিরাই উপজেলার কাইমা গ্রামের কুদরত পাশা বলেন, অনেক কৃষকের খলায় রাখা ধানও পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। জামালগঞ্জ উপজেলার আহসানপুর এলাকার কৃষক আবদুস সালামসহ বিভিন্ন উপজেলার কৃষকেরাও একই ধরনের ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। জেলার হালির হাওর, দেখার হাওর, পাগনার হাওর, ছায়ার হাওর, খাই হাওর, পাখিমারা হাওর এবং করচার হাওরে বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সুরমা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আগামী দুই দিন অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। একই সময়ে ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় উজানের ঢল আরও বাড়তে পারে। ফলে আগামী দুই দিন হাওরাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, সংকটের মধ্যেও কৃষকেরা মাঠে কাজ করছেন এবং ধান কাটার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানান, পরিস্থিতি পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে এবং কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।
সুনামগঞ্জ হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, অনেক কৃষকের চোখের সামনে ধান তলিয়ে যাচ্ছে এবং তারা চরম অসহায় অবস্থার মধ্যে আছেন। অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না, এমনকি অর্ধেক ভাগেও শ্রমিক মিলছে না।
এদিকে অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে জেলার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান সব প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিকে বাঁধে পাহারার নির্দেশ দিয়েছেন। জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। তবে টানা বৃষ্টিতে মাটির বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ায় যেকোনো সময় আরও ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার।



