অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস উইং থেকে বিভিন্ন মানুষকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হুমকি দেওয়া হতো এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে বর্তমান সরকারি দল বিএনপির অবদান ও সংশ্লিষ্টতাকে খাটো করার একটি সুনির্দিষ্ট প্রবণতা তাদের মধ্যে কাজ করত বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন আলোচিত অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের।
বুধবার (৬ মে) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিস্ফোরক পোস্টে সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এই দাবি করেন। শুধু মুখের দাবিই নয়, নিজের এই অভিযোগের পক্ষে শক্ত প্রমাণ হিসেবে তিনি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপ-প্রেসসচিব আজাদ মজুমদারের একটি কথোপকথনের অডিও রেকর্ডও ওই পোস্টের সাথে জুড়ে দেন।
ফেসবুক পোস্টে সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের স্পষ্ট করে বলেন, ‘বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেস উইং থেকে দেশ-বিদেশের নানা মানুষকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হুমকি দেওয়া হতো এবং বর্তমান সরকারি দল বিএনপির গণ-অভ্যুত্থানে সংশ্লিষ্টতা খাটো করার একটা প্রবণতা তাদের মধ্যে কাজ করত। যার একটি প্রমাণ আজ তুলে ধরছি।’ তিনি তথ্য প্রকাশ করে দাবি করেন, ভারতের কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের প্রেসসচিব তারিক চয়ন এবং সাবেক প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেসসচিব আজাদ মজুমদারের মধ্যকার এই ফাঁসি হওয়া ফোনালাপের রেকর্ডটি বিগত ২০২৫ সালের ১৯ জুলাই ধারণ করা হয়েছিল। এর ঠিক এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই (যখন দেশজুড়ে তীব্র গণ-অভ্যুত্থান চলছিল এবং ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ ছিল) তখন তারিক চয়ন আন্তর্জাতিক এক মানবাধিকারকর্মীর কাছে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্পটে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাঠপর্যায়ের লাইভ খবর এসএমএসের মাধ্যমে প্রেরণ করেছিলেন।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৯ জুলাই তারিক চয়ন সেই ঐতিহাসিক এসএমএসগুলোর স্ক্রিনশট নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা করেছিলেন। তারিক চয়ন ফেসবুকে এই পোস্টটি করার কিছুক্ষণের মধ্যেই তৎকালীন সরকারের ভেতরে ‘বিএনপি ঠেকাতে মরিয়া’ উপ-প্রেসসচিব আজাদ মজুমদার বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তারিক চয়নকে ফোন করেন এবং কথোপকথনের এক পর্যায়ে বেশ রাগ ও ধমকের সুরে বলেন, ‘আপনি যে ফেসবুকে লিখলেন বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষ! এটা তো বিএনপির আন্দোলন ছিল না।’
সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের আরও জানান, এই গোপন আলাপের অডিও রেকর্ডটি তার হাতে আসার পর তিনি পুরো বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তারিক চয়নের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেন। সে সময় তারিক চয়ন প্রথমে সরকারের ভেতরের এই স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কিছু বলতে ইতস্তত বোধ করলেও, এক পর্যায়ে ঘটনার সত্যতা পুরোপুরি স্বীকার করেন এবং জানান যে এমন হুমকি বা জবাবদিহি চাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম ছিল না।
এর আগের মাসে অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২২ জুন রাতে তারিক চয়ন বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য (যিনি বর্তমানে দেশের অর্থমন্ত্রী) আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে নিজের তোলা একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন। সেই ছবি পোস্ট করার পরদিনই অর্থাৎ ২৩ জুন সকালে সাবেক উপ-প্রেসসচিব আজাদ মজুমদার তাকে ফোন করে বসেন। তিনি অত্যন্ত চড়া সুরে তারিক চয়নের কাছে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক জবাবদিহি চান যে—কেন গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত একটি অন্তর্বর্তী সরকারের চাকরি বা প্রটোকলে থেকে তারিক চয়ন একজন শীর্ষ বিএনপি নেতার সঙ্গে হাসিমুখে ছবি পোস্ট করেছেন?
তখন তারিক চয়নও দমে না গিয়ে আজাদ মজুমদারের কাছে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে জানতে চান, ‘আপনি যেই গণ-অভ্যুত্থানের কথা বলছেন সেই গণ-অভ্যুত্থানে কি বিএনপি অংশ নেয়নি? আমি নিজেও তো অংশ নিয়েছি সাংবাদিক হিসেবে, মানবাধিকারকর্মী হিসেবে, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে।’ তারিক চয়নের এই যৌক্তিক ও সোজাসাপ্টা প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে না পেরে তৎকালীন উপ-প্রেসসচিব আজাদ মজুমদার ওপাশে চরম রাগে গড়গড় করতে থাকেন। তারিক চয়ন আক্ষেপ করে জানান, বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে তোলা ওই ছবিটি ফেসবুক থেকে ডিলিট বা মুছে না দেওয়ার কারণে তাকে পরবর্তীতে প্রশাসনিকভাবে বড় ধরনের খেসারত ও মাসুল দিতে হয়েছিল। কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের কিছু অসাধু অফিসারকে ঢাকার তৎকালীন মূল প্রেস উইং থেকে অলিখিত ও গোপন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যেন তারা তারিক চয়নকে অফিশিয়াল সব কাজে চরম অসহযোগিতা করেন এবং তাকে সার্বক্ষণিক মানসিকভাবে ব্যাপক চাপের মধ্যে রাখেন।



