অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক
বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করার দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে আগামী জুন মাসের মধ্যে মাঠপর্যায়ে থাকা সেনাবাহিনীর সমস্ত সদস্যকে চূড়ান্তভাবে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে।
বিগত ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশের তৎকালীন বিশেষ পরিস্থিতিতে বেসামরিক প্রশাসনকে জোরদার সহায়তা করতে মাঠপর্যায়ে নেমেছিলেন প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোটা কালজুড়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে নিয়োজিত ছিলেন তাঁরা। সম্প্রতি দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে সরকার গঠনের পর এবার সেনাসদস্যদের ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত ২১ এপ্রিল দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিখুঁত মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের লক্ষ্যে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিশেষ কোর কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছিল। সেই পুনর্গঠিত কোর কমিটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সভাটি গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আড়াই ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠকে দেশের পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালকসহ সরকারের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই সভাতেই মাঠপর্যায় থেকে চূড়ান্তভাবে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করার সময়সূচি চূড়ান্ত করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ৬ জুন থেকে মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত সেনাসদস্যদের দেশজুড়ে চূড়ান্ত প্রত্যাহার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই প্রত্যাহারের কৌশল হিসেবে প্রথমে দেশের দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে সেনা ক্যাম্প ও সদস্যদের ব্যারাকে তুলে আনা হবে এবং পরবর্তীতে ধাপে ধাপে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর এবং বড় জেলাগুলো থেকে তাঁদের সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা হবে। পুরো জুন মাসের সময়সীমার মধ্যে সেনাবাহিনীর সব সদস্যকে মাঠপর্যায় থেকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শেষ হবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন থেকে দেশব্যাপী পরিস্থিতি ব্যাপক সহিংস হয়ে উঠলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সারা দেশে কঠোর কারফিউ জারি করে সেনা নামিয়েছিল। পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার প্রবল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ওই বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশের পুলিশ বাহিনী পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে সেনাবাহিনী মাঠে থেকে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীকে বিশেষ বিচারিক ক্ষমতাও (ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার) প্রদান করেছিল। এর মাঝে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসেই বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, দেশের পুলিশ বাহিনী সম্পূর্ণরূপে পুনর্গঠিত হলে সেনাসদস্যরা দ্রুত নিজ নিজ কর্মস্থলে তথা ব্যারাকে ফিরে যাবেন। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে কিছু কিছু এলাকা থেকে সেনাসদস্যদের মাঠ থেকে প্রত্যাহার করা শুরু হয়েছিল। তবে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাসদস্যরা অন্য সব বছরের মতো এবারও পুরো দেশজুড়ে সক্রিয় মাঠে ছিলেন। সংসদ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর সেনাপ্রধান গত ১৬ ফেব্রুয়ারি পুনরায় আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, দেশে নবনির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেই সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে। বর্তমান সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্র থেকে জানা গেছে, সারা দেশে মাঠপর্যায়ে এখনও সর্বমোট ১৭ হাজার সেনাসদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে একটানা মাঠপর্যায়ে কঠিন দায়িত্ব পালন করায় সেনাবাহিনীর এই সদস্যরা বেশ ক্লান্ত এবং তাঁদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সেনা প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছিল। সেই অনুরোধ ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে গতকাল কোর কমিটির সভায় জুনের মধ্যে সেনা সরানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়, যা দ্রুতই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
সেনা প্রত্যাহারের পাশাপাশি এই মেগা বৈঠকে দেশের আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে যেসব সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁদের মুক্তির বিষয়ে বৈঠকে বিশেষ আলোচনা করা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, যেসব সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরনের ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ নেই, আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁদের জামিন যেন কোনোভাবে আটকে দেওয়া না হয়। একই সাথে কোনো সাংবাদিক যদি ব্যক্তিগত বা পেশাগত কারণে দেশের বাইরে যেতে চান, তবে তাঁকে বিমানবন্দর বা কোথাও কোনো ধরনের প্রশাসনিক হয়রানি না করার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশের অবৈধ অস্ত্র ও লাইসেন্স প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন (২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত) রাজনৈতিক বিবেচনায় নীতিমালার তোয়াক্কা না করে যাঁদের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের সমস্ত লাইসেন্স বাতিল ও অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করার কার্যক্রম চলমান থাকবে। এছাড়া বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বিশেষ গানম্যান দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে। সমাজে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের চলমান কঠোর অভিযান আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোর কমিটি এবং এই বিষয়ে সামাজিক প্রচারণা ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দেশের অর্থনৈতিক স্থীতিশীলতা বজায় রাখতে সারা দেশের হাট-বাজার, ঘাট ও সড়কে চলমান চাঁদাবাজির বিষয়েও সভায় অত্যন্ত কঠোর আলোচনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, যাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে সরাসরি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে। এই চাঁদাবাজির অপরাধে জড়িত ব্যক্তি কে, তিনি কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য বা কত বড় মাপের নেতা— তা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র বিবেচনা করা হবে না। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের সাম্প্রতিক ফলাফল এবং সেখানে হওয়া রাজনৈতিক পালাবদলের বিষয়টি নিয়েও কোর কমিটির সভায় বিশেষ কৌশলগত আলোচনা হয়। পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে সামনের দিনগুলোয় বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় যেন কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ বা চোরাচালান না ঘটে, সেজন্য সীমান্তজুড়ে বিজিবিসহ অন্যান্য সংস্থাকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বৈঠকের একেবারে শেষ পর্যায়ে পুলিশের নতুন পোশাক পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এ সময় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) প্যান্টের রং যেন কোনোভাবেই ‘খাকি’ না করা হয়, সে বিষয়ে একটি বিশেষ অনুরোধ জানান। তবে সভায় বিস্তারিত আলোচনার পর আইজিপির এই ব্যক্তিগত অনুরোধটি শেষ পর্যন্ত আর বিবেচনা করা হয়নি। অর্থাৎ সরকারের পূর্বনির্ধারিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুলিশের নতুন পোশাক হিসেবে নেভি ব্লু শার্ট এবং খাকি প্যান্টই বহাল থাকছে।



