বগুড়ার আদমদীঘির সান্তাহারে মাত্র একজোড়া সোনার দুলের লোভে ৫ বছর বয়সী শিশু রাখা মনিকে গলায় দড়ির ফাঁস লাগিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে প্রতিবেশী এক দম্পতি, যার জেরে বিক্ষুব্ধ জনতা ঘাতকদের গণপিটুনি দিয়ে বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে এবং পুলিশ এই ঘটনায় দম্পতিসহ ৩ জনকে আটক করেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার আসরের আজানের পর সান্তাহার পৌর শহরের সাহেব পাড়া মহল্লায় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে। নিহত ৫ বছর বয়সী রাখা মনি স্থানীয় সাহেব পাড়া এলাকার বাসিন্দা ও অটোভ্যান গ্যারেজের কর্মচারী আবু রায়হানের শিশুকন্যা। শিশুটির মা অন্যত্র বিয়ে করায় সে তার দাদীর কাছে থাকত এবং স্থানীয় একটি নূরানী মাদরাসার নার্সারী শ্রেণীতে পড়াশোনা করত। প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার বিকেলে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রতিবেশী আমজাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে সরকারি কলেজ এলাকায় প্রাইভেট পড়তে যাচ্ছিল। এই সময় শিশুটিকে একা পেয়ে ফুসলিয়ে বা জোরপূর্বক আমজাদ তার বাড়ির ভেতরে নিয়ে যায়।
সেখানে শিশুটির কানে থাকা একজোড়া সোনার দুল ছিনিয়ে নিয়ে আমজাদ (৪০) ও তার স্ত্রী বন্যা বেগম (৩০) মিলে শিশুটির গলায় দড়ির ফাঁস লাগিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর অপরাধ আড়াল করার উদ্দেশ্যে তারা শিশুটির লাশ একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে নিজ বাড়ির মেঝেতে লুকিয়ে রাখে। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত শিশুটিকে কোথাও না পেয়ে তার বাবা, ফুপু ও দাদীসহ পরিবারের সদস্যরা প্রতিবেশীদের নিয়ে সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজতে বের হন। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে আমিন নামের এক কিশোর প্রতিবেশী আমজাদের বাড়িতে তল্লাশি করতে গিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির মরদেহ দেখতে পায়।
এই খবর মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শত শত বিক্ষুব্ধ জনতা আমজাদের বাড়ি ঘেরাও করে। জনতা অভিযুক্ত আমজাদ হোসেন ও তার স্ত্রী বন্যা বেগমকে ধরে গণপিটুনি দেয়। খবর পেয়ে সান্তাহার পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক খন্দকার ফরিদ হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আমজাদ ও বন্যাকে আটক করে। একই সাথে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে প্রতিবেশী আব্দুল কাদেরের ছেলে বাবু (৩৮)-কেও আটক করা হয়। পুলিশ আসামিদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার পরপরই উত্তেজিত এলাকাবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং আসামিদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে তা সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়। এই সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে সান্তাহার পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শকসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত রাখা মনির মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং মূল অভিযুক্ত আমজাদ, তার স্ত্রী বন্যা ও সন্দেহভাজন বাবুসহ মোট ৩ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ঘটনার সাথে যোগসূত্র থাকার সন্দেহে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও এক অজ্ঞাতনামা নারীকে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। সান্তাহার পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক খন্দকার ফরিদ হোসেন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, প্রাথমিকভাবে সোনার দুলের লোভেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে তারা প্রমাণ পেয়েছেন। এদিকে নিজের একমাত্র কন্যাসন্তানকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ বাবা আবু রায়হান অশ্রুসিক্ত চোখে প্রশাসনের কাছে ঘাতকদের সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।



