প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মোট স্থায়িত্বকালকে ছাড়িয়ে গিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন দীর্ঘস্থায়ী এক নতুন রেকর্ড গড়েছে, যা বিশ্বকে আরও বড় যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন ইউক্রেন আক্রমণ করেন, তখন তিনি হয়তো ভেবেছিলেন মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে কিয়েভ দখল করে নেবেন। কিন্তু ইউক্রেনের পাল্টা প্রতিরোধ সবাইকে চমকে দেয়। কয়েকদিন বা কয়েক মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও এই যুদ্ধ এখন নতুন মাইলফলক গড়ছে। যুদ্ধ আসলে কোনো হিসাব মেনে চলে না, যেমনটি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েল মিলে যখন ইরানে হামলা চালায়, তখন তারা ভাবেনি যে ইরান তাদের এমন কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কিছুটা আড়ালে ফেলে দিলেও এই যুদ্ধ থেমে থাকেনি। বরং গত ১১ জুন এই যুদ্ধ এক নতুন বেদনাদায়ক মাইলফলক গড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মোট স্থায়িত্বকালকেও ছাড়িয়ে গেছে। ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই শুরু হয়ে ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত চলা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ মোট ১ হাজার ৫৬৭ দিন স্থায়ী হয়েছিল। গত ১১ জুন সেই রেকর্ড ভেঙে আজকের হিসাব পর্যন্ত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ টানা ১ হাজার ৫৭০ দিন ধরে চলছে, যা আধুনিক সময়ে সভ্যতার জন্য এক গ্লানির রেকর্ড।
দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া মুশকিল, কারণ নিজ নিজ সুবিধার জন্য অনেক সময় ক্ষয়ক্ষতি আড়াল করা হয় কিংবা বাড়িয়ে বলা হয়। তবে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধের মোট আর্থিক ক্ষতি ও ব্যয়ের পরিমাণ ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা সামগ্রিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকেই বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে। আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় আঘাত এসেছে মানুষের প্রাণে; বিভিন্ন হিসেবে এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৫ লাখ মানুষ মারা গেছে এবং আহত ও নিখোঁজসহ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়েছে। এই যুদ্ধের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি কোনো সম্পর্ক না থাকলেও অন্তত ৪০ জন বাংলাদেশি তরুণ ইউক্রেন ফ্রন্টে প্রাণ হারিয়েছেন। উন্নত জীবনের আশায় দালালদের খপ্পরে পড়ে রাশিয়ায় যাওয়া এই তরুণদের প্রতিশ্রুতি ভেঙে জোর করে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
যুদ্ধের আড়ালে নানা কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও তা কার্যকর হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আশায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা করেছিলেন, তবে তিনি নোবেলও পাননি এবং যুদ্ধও বন্ধ করতে পারেননি; বরং বিশ্বকে আরও বৃহত্তর পরিসরের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। এরই মধ্যে গত ৪ জুন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে পাঠানো এক খোলা চিঠিতে সুইজারল্যান্ড বা তুরস্কের মতো কোনো নিরপেক্ষ দেশে সরাসরি মুখোমুখি বৈঠকের প্রস্তাব দেন। ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্ররা কিছু শর্তসহ এই প্রস্তাব সমর্থন করলেও পুতিন শর্তযুক্ত সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং যুদ্ধ করেই লক্ষ্য অর্জনের কথা জানিয়েছেন। এক জরিপে দেখা গেছে, ইউক্রেনের অধিকাংশ নাগরিক মনে করেন আগামী বছরের আগে এই যুদ্ধ থামবে না। ফলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে ছাড়িয়ে এখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্থায়িত্বের রেকর্ডের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।



