রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ ও চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনার জেরে এক মৃত মায়ের মরদেহ ফেরত পেতে তার ছোট ছেলেকে চিকিৎসকদের সামনে কান ধরে উঠবস করে ক্ষমা চাইতে হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।গত শনিবার (১৩ জুন) রংপুর মহানগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দা নূর নাহার বেগম নামের এক নারীকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ভোরবেলা রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়। রোগীর পরিবারের সদস্যদের দাবি, হাসপাতালে ভর্তির মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায় নূর নাহার বেগম সঠিক চিকিৎসার অভাবে মারা যান। এ সময় হাসপাতালে অক্সিজেনের তীব্র সংকট ছিল এবং চিকিৎসকেরা রোগীর চিকিৎসায় চরম অবহেলা করেছেন এমন অভিযোগ তুলে নূর নাহার বেগমের ক্ষুব্ধ স্বজনরা হাসপাতালের ভেতরেই তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করেন।
হাসপাতাল সূত্র ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা গেছে, চিকিৎসায় অবহেলার এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের প্রথমে তীব্র কথা-কাটাকাটি হয় এবং একপর্যায়ে তা দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারিতে রূপ নেয়। এই সংঘর্ষের ঘটনায় হাসপাতালের কর্তব্যরত মেডিক্যাল অফিসার চিকিৎসক রাকিব হাসান এবং ইন্টার্ন চিকিৎসক নাইম বকশী রোগীর স্বজনদের হাতে শারীরিক লাঞ্ছনা ও মারধরের শিকার হয়েছেন বলে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়। এদিকে হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর এমন হামলার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা একযোগে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা এই ঘটনার বিচার না পাওয়া পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সমস্ত চিকিৎসা কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। এর ফলে শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং একই সাথে মৃত নূর নাহার বেগমের মরদেহ হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র না দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে মর্গে নিয়ে আটকে রাখা হয়।
অন্যদিকে মায়ের মরদেহ দ্রুত হস্তান্তরের দাবিতে এবং দীর্ঘক্ষণ মরদেহ আটকে রাখার প্রতিবাদে রোগীর স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনের রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক সম্পূর্ণ অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এর ফলে ওই ব্যস্ততম মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়, যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বিঘ্নিত হয় এবং পুরো এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মৃতের বড় ছেলে নুরুজ্জামান রিন্টু ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন যে, তার মা শনিবার ভোরে মারা গেলেও প্রায় ১০ ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পরও তারা মায়ের মুখ দেখতে পারেননি। তারা চিকিৎসকদের কাছে বারবার হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলেও মায়ের মরদেহ ফেরত দেওয়া হয়নি। স্বজনদের আরও দাবি, চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনার জেরে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা মরদেহ হস্তান্তরে দীর্ঘ বিলম্ব করেন এবং মরদেহ ছাড়ার জন্য নানা শর্ত জুড়ে দেন। একপর্যায়ে মায়ের মরদেহ ফিরে পাওয়ার আকুলতায় মৃতের ছোট ছেলে রিফাত হোসেনকে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে উপস্থিত হয়ে চিকিৎসকদের সামনে তাকে কান ধরে উঠবস করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। ইতিমধ্যে এই কান ধরে উঠবসের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত কান ধরে উঠবসের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, হাসপাতালের ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন বা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে চিকিৎসকদের মারধর করার স্পষ্ট প্রমাণ দেখা গেছে। একজন কর্তব্যরত চিকিৎসকের ওপর কর্মক্ষেত্রে এমন হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং অমানবিক। এই ঘটনার পর হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় নিরাপত্তার স্বার্থেই নূর নাহার বেগমের মরদেহটি সাময়িকভাবে মর্গে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে স্বজনদের কাছে মায়ের মরদেহটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।



