রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও বীর শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার ঐতিহাসিক এবং বিস্তারিত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।আজ রবিবার (১৪ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর পক্ষ থেকে মোট ৮০৯ পৃষ্ঠার এই বিশাল ও বিস্তারিত পূর্ণাঙ্গ রায়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে গত ৯ এপ্রিল বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই মামলার সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেছিলেন। সেই রায়ে তৎকালীন দায়িত্বরত ২ জন পুলিশ সদস্যকে সরাসরি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি অন্য ৩ জন আসামিকে আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি আসামিদের অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও সাজা প্রদান করা হয়েছে। গত ৫ মার্চ এই বর্বরোচিত ও সংবেদনশীল মামলার উভয় পক্ষের দীর্ঘ যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন ও আইনি আইডেন্টিফিকেশন শেষ হওয়ার পর আদালত রায় ঘোষণার জন্য এই দিনটি সুনির্দিষ্টভাবে ধার্য করেছিলেন।
শহীদ আবু সাঈদ ছিলেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের একজন অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী। বিগত ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দেশব্যাপী চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের পার্ক মোড় এলাকায় সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও বুক টানিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পুলিশের নির্বিচার ও নৃশংস গুলিবর্ষণের শিকার হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এই নির্মম ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সুনির্দিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত শেষে এই বর্বরোচিত মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মোহাম্মদ হাসিবুর রশীদসহ দেশের মোট ৩০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে সরাসরি আসামি করা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে সাবেক উপাচার্যসহ মোট ২৪ জন আসামি মামলার শুরু থেকেই আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বর্তমানে সম্পূর্ণ পলাতক অবস্থায় রয়েছেন।
ঐতিহাসিক এই মামলায় এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মোট ৬ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃত এই আসামিরা হলেন—বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ, পুলিশের সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন, পুলিশের সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ। এই মামলায় আদালতের কাঠগড়ায় প্রসিকিউশনের পক্ষে অর্থাৎ রাষ্ট্রপক্ষে অত্যন্ত জোরালো আইনি যুক্তি ও প্রমাণ উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম এবং গাজী এমএইচ তামীম। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে নিয়োজিত ছিলেন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো ও আজিজুর রহমান দুলুসহ আরও বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। আর পলাতক থাকা ২৪ জন আসামির পক্ষে আইনি লড়াই ও আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আদালত কর্তৃক রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সুজাদ মিয়া।
প্রকাশিত এই রায়ের সার্বিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, দীর্ঘ নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে আসামিদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে সম্পূর্ণ সন্দেহাতীত, অকাট্য এবং ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। যার ফলে বিজ্ঞ আদালত এই ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন এবং তিনি আশা প্রকাশ করেন যে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধেও সমস্ত অভিযোগ আদালতে শতভাগ প্রমাণিত হবে। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতের এই রায়ের পর নিজেদের ভিন্ন দাবি তুলে ধরে বলেন যে, প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো আইনগতভাবে প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং তারা উচ্চ আদালতে আপিলের মাধ্যমে সব আসামির খালাস পাবেন বলে আশা প্রকাশ করছেন।



