পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের যোগদানের মাধ্যমে রাজ্য রাজনীতিতে রাতারাতি আলোচনা ও জনকৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে পূর্বে প্রায় অপরিচিত দল ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ বা এনসিপিআই।রবিবার, চৌদ্দ জুন সন্ধ্যা পর্যন্তও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই নামের এই দলটির অস্তিত্ব সম্পর্কে সাধারণ মানুষের তেমন কোনো ধারণা ছিল না। তবে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে তৃণমূলের বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা যখন জানান যে তাদের ব্লক বা গোষ্ঠীটি এনসিপিআই-তে যোগ দিচ্ছে, তখনই প্রথম দলটির নাম প্রকাশ্যে আসে। হঠাৎ আলোচনায় আসার পর এনসিপিআই একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক পেজ খোলে, যেখানে সর্বশেষ অনুসারী বা ফলোয়ারের সংখ্যা ছিল আটশত সত্তর এবং এই সংখ্যাটি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দলটির ফেসবুক পেজের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর প্রধান কার্যালয় পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার সাঁকরাইল থানার হাটগাছা গ্রামে অবস্থিত। মূলত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে প্রথম আত্মপ্রকাশ করা এই রাজনৈতিক দলটির পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সাংগঠনিক দায়িত্বে আছেন হাটগাছার বাসিন্দা ও পেশায় আইনজীবী শিউলি কুন্ডু। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত এবং একটি স্বেচ্ছাসেবী বা সামাজিক কল্যাণ সংস্থা পরিচালনা করেন, যেখানে তার স্বামী উত্তীয় কুন্ডুও তাকে সহযোগিতা করেন। এনসিপিআই-এর ফেসবুক পেজে তৃণমূলের বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের স্বাগত জানিয়ে একাধিক পোস্ট করা হয়। এর মধ্যে বারাসতের সংসদ সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে লোকসভায় দলের নেতা হিসেবে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি পোস্ট করা হলেও পরবর্তীতে সেটি মুছে ফেলা হয়েছে। অন্য একটি পোস্টে এনসিপিআই দাবি করেছে যে, লোকসভায় সংসদ সদস্যের সংখ্যার বিচারে তারাই এখন পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় দল। সেই পোস্টে প্রকাশিত একটি গ্রাফিকে দেখানো হয়, রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির বারো জন, তৃণমূলের আট জন এবং কংগ্রেসের একজন সংসদ সদস্য রয়েছেন এবং একই সঙ্গে দাবি করা হয় এনসিপিআই-এর সংসদ সদস্য সংখ্যা এখন বিশ জন। পোস্টে তারা উল্লেখ করে, লোকসভায় বিশটি আসন নিয়ে এনসিপিআই এখন সংসদীয় শক্তির বিচারে পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি এবং জাতীয় পর্যায়ে রাজ্যের প্রধান কণ্ঠস্বর।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই দুই হাজার তেইশ সালে একটি নিবন্ধিত কিন্তু অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল বা আরইউপিপি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। দলটি দুই হাজার তেইশ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে কৈলাসহর ও চউমানু নামের দুটি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল, যেখানে তাদের নির্বাচনী প্রতীক ছিল কলমের নিব ও সাতটি রশ্মি। তবে সেই নির্বাচনে তাদের কোনো প্রার্থীই জয়ী হতে পারেননি। কৈলাসহর আসনে দলের প্রার্থী জাহাঙ্গির আলি দুইশত ছিয়াশি ভোট এবং চউমানু আসনে বড়জেদা ত্রিপুরা পাঁচশত ছত্রিশ ভোট পেয়েছিলেন। রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা থাকলেও রবিবার লোকসভার বিদ্রোহী বিশ জন সংসদ সদস্য নতুন এই দলটির পাশে দাঁড়িয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এর আগে বিধানসভায় ঘটে যাওয়া দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য ও জটিল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই লোকসভার বিদ্রোহীরা আইনি ঝুঁকি এড়াতে এই সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। এর আগে বিধানসভায় দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী বিধায়কেরা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, যিনি পরবর্তীতে বিরোধী দলনেতা হন। তবে এই নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয় এবং তৃণমূলের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয় যে বহিষ্কৃত কেউ কীভাবে বিরোধী দলনেতা হতে পারেন। এই সংক্রান্ত একটি মামলা এখনও উচ্চ আদালত বা হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। এই জটিল আইনি পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই লোকসভার বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা ঝুঁকি এড়াতে নতুন দল এনসিপিআই-এর প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দুই হাজার বাইশ সাল থেকে হাটগাছায় এনসিপিআই-এর একটি কার্যালয় রয়েছে। দলটি দুই হাজার তেইশ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে অংশ নিয়ে হাওড়ার ঝোড়হাট গ্রাম পঞ্চায়েতের একটি আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরই স্থানীয়রা প্রথম এই দলের নাম জানতে পারেন। তবে এরপর লোকসভা ও দুই হাজার ছাব্বিশ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলটিকে আর তেমন সক্রিয় দেখা যায়নি। বর্তমানে দলটির নাম ছড়িয়ে পড়ার পরপরই হাটগাছার দলীয় কার্যালয়ের সামনে বহু মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেন। তবে কার্যালয়ে গিয়ে ডাকাডাকি করলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতি ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে এনসিপিআই-এর কার্যালয়ের সামনে স্থানীয় পুলিশ এবং ভারতের কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এনসিপিআই-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক জাতীয় সংগঠক সাধারণ সম্পাদক শান্তনু দে বলেন যে, তিনি এই দলের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়া সত্ত্বেও আজ যা ঘটেছে সে সম্পর্কে তাকে আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি। তিনি আরও জানান যে, আগে জানতে পারলে তিনি এর তীব্র বিরোধিতা করতেন এবং এখনও তিনি এই যোগদানের বিরোধিতা করছেন। শান্তনু দে দলটির বর্তমান সভাপতি হিসেবে উত্তীয় কুন্ডুর নাম উল্লেখ করেন। এই বিষয়ে উত্তীয় কুন্ডুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তৃণমূলের বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের যোগদানের বিষয়ে তিনি নতুন করে আর কিছু বলতে চান না, তবে শান্তনু দে’র ব্যাপারে তিনি মন্তব্য করেন যে দলে শান্তনুর কার্যকালের মেয়াদ ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছে। দলের অপর এক নারী সদস্য ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শিউলি কুন্ডু জানান যে, তিনি পূর্বে সভাপতি থাকলেও বর্তমানে পদত্যাগ করেছেন এবং এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করবেন না, যা বলার পরে বলবেন। তবে তৃণমূলের এই সংসদ সদস্যদের যোগদানে তিনি ব্যক্তিগতভাবে খুশি কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি সংক্ষিপ্ত জবাবে ‘হ্যাঁ’ বলেন এবং তাদের স্বাগত জানান।



