আইন, সুশাসন ও আর্থিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই অধ্যাপক ডাক্তার এ বি এম আব্দুল্লাহর আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক পদের নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) কর্তৃপক্ষ।শনিবার (২৭ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের সই করা এক দীর্ঘ দ্বিপক্ষীয় ব্যাখ্যামূলক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস পদে অধ্যাপক ডাক্তার এ বি এম আব্দুল্লাহর নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে গভীর আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। সবার অবগতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো যাচ্ছে যে, এই সিদ্ধান্ত কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গৃহীত হয়নি; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, এই নিয়োগকে ঘিরে একাধিক প্রক্রিয়াগত, প্রশাসনিক ও আর্থিক গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, যা বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করেছে।
নথির বিবরণ অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জারি করা অফিস আদেশে ৬৬তম একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ এবং ৮৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অধ্যাপক ডাক্তার এ বি এম আব্দুল্লাহকে ৩ বছরের নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নিয়োগ প্রদান করা হয়েছিল। এই নিয়োগকালে তাকে মাসিক ৩০ হাজার টাকা সম্মানী, চিকিৎসা সুবিধা এবং সীমিত প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়া হতো। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক দায়বদ্ধতা ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে আবদ্ধ। উক্ত নিয়োগ সম্পূর্ণ বিধি অনুযায়ী হওয়ায় তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সিন্ডিকেট এই নিয়োগ নিয়ে কোনো ধরনের আপত্তি বা প্রশ্ন তোলেনি।
তবে তার মূল নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস আগে ২০ জুন, ২০২৪ তারিখে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ৯২তম সভায়, যা মূলত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের জন্য নির্ধারিত ছিল, সেখানে প্রফেসর ইমেরিটাস অধ্যাদেশ সংশোধনের মাধ্যমে এই পদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আজীবন নিয়োগের বিধানসহ আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়। এই নতুন নিয়োগে অধ্যাপক আব্দুল্লাহর মাসিক সম্মানী নির্ধারণ করা হয় অধ্যাপক হিসেবে তার অবসরে যাওয়ার সময়ের মূল ভাতার সমপরিমাণ। এর পাশাপাশি তিনি আজীবন চিকিৎসা সুবিধা, নিজস্ব স্টাফসহ অফিস ও অন্যান্য বিস্তৃত সুযোগ-সুবিধা পাবেন বলে নির্ধারণ করা হয়। সিন্ডিকেটের বাজেট অধিবেশনে মূল এজেন্ডার বাইরে গিয়ে এই ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রস্তাব উত্থাপন সম্পূর্ণ নজিবিহীন ও বেআইনি। এতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এই নিয়োগ তড়িঘড়ি বিবেচনার মাধ্যমে কেবল একজনকে বিশেষ আইনি সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল এবং এ পর্যন্ত তিনি এই খাত থেকে আনুমানিক সাড়ে ১৪ লাখ টাকারও বেশি অর্থ গ্রহণ করেছেন।
বিএমইউ কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রফেসর ইমেরিটাস নিয়োগের ক্ষেত্রে অধ্যাদেশের ধারা ৫ অনুযায়ী বিভাগীয় চেয়ারম্যানের লিখিত প্রস্তাব, ডিনের মাধ্যমে উপাচার্যের কাছে উপস্থাপন, উপাচার্য কর্তৃক একটি উচ্চপর্যায়ের মূল্যায়ন কমিটি গঠন এবং সেই কমিটির আনুষ্ঠানিক সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদানের স্পষ্ট আইনি বিধান রয়েছে। কিন্তু অধ্যাপক ডাক্তার এ বি এম আব্দুল্লাহর ক্ষেত্রে এই নির্বাচন প্রক্রিয়া মোটেও যথাযথভাবে অনুসরণ না করে কেবলমাত্র একজন সদস্যের মৌখিক প্রস্তাব অনুযায়ী তাকে আজীবনের জন্য প্রফেসর ইমেরিটাস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যেখানে তার যোগ্যতা হিসেবে কেবল ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত चिकित्सक’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এই নিয়োগ পাওয়ার পর গত প্রায় ২ বছর তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে আসেননি, কোনো প্রকার শিক্ষাদান করেননি, কোনো গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেননি কিংবা প্রশাসনকেও নিজের কার্যক্রম সম্পর্কে কোনো কিছু অবহিত করেননি; কিন্তু ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে নিয়মিত বিপুল অঙ্কের বেতন-ভাতা ঠিকই উত্তোলন করেছেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর ইমেরিটাস পদে নিয়োগের নজির থাকলেও কোনো প্রফেসর ইমেরিটাসকে আজীবনের জন্য পূর্ণকালীন অধ্যাপকের সর্বোচ্চ বেতনের সমপরিমাণ পারিশ্রমিক এবং এ ধরনের বিস্তৃত আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধা প্রদানের নজির কোথাও পাওয়া যায় না। বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি পর্যালোচনাকালে দেখতে পায় যে, এই ব্যবস্থার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি ও পুনরাবৃত্ত আর্থিক দায় সৃষ্টি হয়েছে। ২০২২ সালের ব্যবস্থায় এই পদটি ছিল একটি সীমিত সম্মানীভিত্তিক পদ, কিন্তু ২০২৪ সালের সংশোধনের মাধ্যমে পূর্ণকালীন অধ্যাপকের সর্বোচ্চ বেতনের সমপরিমাণ পারিশ্রমিক নির্ধারণ করায় এটি সম্মানসূচক পদের পরিবর্তে কার্যত বেতনসদৃশ আর্থিক সুবিধাসংবলিত পদে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধি অনুযায়ী অর্থ কমিটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের তত্ত্বাবধান এবং আর্থিক বিষয়ে সিন্ডিকেটকে পরামর্শ প্রদান করা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিতে বিষয়টি অর্থ কমিটিতে উপস্থাপন, আর্থিক বিশ্লেষণ কিংবা অর্থ কমিটির কোনো সুপারিশের তথ্য পাওয়া যায়নি, যা আর্থিক সুশাসনের পরিপন্থী।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মনে করে, বেআইনিভাবে এজেন্ডার বাইরে প্রস্তাব উত্থাপন করে কোনো অধ্যাদেশ সংশোধনের পর একই সভায় সেই সংশোধিত বিধানের সুবিধা তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োগ করা প্রশাসনিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে চরম বিতর্কিত এবং তা আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। বর্তমান সিন্ডিকেট গত ১৩ জুনের সভায় সমস্ত তথ্য-уপাত্ত বিশ্লেষণ করে ২৮ জুন অধ্যাপক ডাক্তার এ বি এম আব্দুল্লাহর আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগকে সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত বিবেচনা করে বাতিল করতে বাধ্য হয়। বিধি অনুযায়ী যদি কোনো নিয়োগ পরবর্তীকালে প্রক্রিয়াগত বা আইনি ত্রুটির কারণে বাতিল বা অকার্যকর বলে বিবেচিত হয়, তবে সেই নিয়োগের ভিত্তিতে দেওয়া আর্থিক সুবিধাও পুনরুদ্ধারের বাধ্যবাধকতা কর্তৃপক্ষের রয়েছে। সেই অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উক্ত সময়ের বেতনের টাকা ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেছে। এটি প্রচলিত আইনের বিধান, কাউকে হয়রানি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য নয়। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা রক্ষার স্বার্থে আইন ও বিধিমালার যথাযথ অনুসরণ সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।



