ফ্রান্সে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে জেন-জি তরুণ ও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আহত হয়েছেন অন্তত ১৫০ পুলিশ সদস্য। খবর রয়টার্সের।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে আসেন। একপর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে পার্ক করা গাড়িতে আগুন দেওয়া, দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার শহরের সড়কগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছেন।
রাজধানী প্যারিসের পাশাপাশি মার্সেই, নিস, নঁত, বোর্দো, লিমোজ, লিল, তুলুজ ও স্ত্রাসবুর্গসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটির দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল ৮ লাখ।
পুলিশ-বিক্ষোভকারী সংঘর্ষ, আহত শতাধিক
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত মিছিল নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। এর জবাবে বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ও আতশবাজি নিক্ষেপ করেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সাঁ-এতিয়েনে পুলিশের ব্যবহৃত একটি গ্রেনেডের আঘাতে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের ডান হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বিক্ষোভের পরও বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। মুখোশ পরা একদল তরুণ দোকানের শাটার ভেঙে ভেতরে ঢুকে পণ্য লুট করেন। সুপারমার্কেট, ফার্মেসি, পোশাকের দোকান, প্রসাধনসামগ্রীর বিক্রয়কেন্দ্র ও ইলেকট্রনিক পণ্যের দোকানেও হামলা চালানো হয়।
পৌর ভবনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর
বিক্ষোভকারীদের হামলায় বিভিন্ন শহরের সরকারি ও প্রশাসনিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লিমোজ শহরের ১৪০ বছরের বেশি পুরোনো পৌর ভবনে আগুন দেওয়া হলে সেটি প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। মার্সেই ও লিল শহরের আরও দুটি পৌর ভবনে ভাঙচুর চালানো হয়।
এ ছাড়া বোর্দো শহরে পুলিশের একটি স্থাপনা এবং লিয়ঁ শহরে একটি পর্যটন তথ্যকেন্দ্রে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
সহিংসতাকারীদের শাস্তির হুঁশিয়ারি ম্যাক্রোঁর
বিক্ষোভে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, যারা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সরকারি স্থাপনায় হামলা ও লুটপাটে জড়িত, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, চলমান পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছেন বিরোধী নেতারা। আগামী বছরের এপ্রিল ও মে মাসে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে বিক্ষোভ ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।
নতুন বিপ্লবের ডাক বিক্ষোভকারীদের একাংশের
ফ্রান্সে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল। এর মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ২০১৮ সালে জ্বালানি কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীরাও।
বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভের পেছনে মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি সরকারের নীতির প্রতি অসন্তোষও কাজ করছে। প্যারিসের পূর্ব ও উত্তরাঞ্চল দিয়ে যাওয়া একটি বড় মিছিলে অংশ নেওয়া কয়েক হাজার মানুষের কেউ কেউ ‘ম্যাক্রোঁ, পদত্যাগ করো’ স্লোগান দেন।
বিক্ষোভকারীদের একাংশ বর্তমান আন্দোলনকে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করছেন। মার্সেই শহরে মেয়রের কার্যালয়ে প্রবেশের সময় তাঁদের কয়েকজনকে ‘এটাই বিপ্লব—আমরা বাস্তিল দখল করছি’ স্লোগান দিতে শোনা যায়।
পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লা রশেলে বিক্ষোভকারীরা ‘বিপ্লব অথবা মৃত্যু’ লেখা ব্যানার নিয়ে মিছিল করেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মনপেলিয়েতে একটি কেন্দ্রীয় চত্বরে ‘জনগণ জয়ী হবে’ লেখা বিশাল নীল ব্যানার ওড়ানো হয়।
প্যারিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি সংগঠন এলএসইউর প্রধান রিয়াদ রানি বলেন, সরকার চাপে রয়েছে। ফরাসি জনগণ ক্ষুব্ধ হলে সহজে থামে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।



