অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক
দেশের সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতি বর্তমানে অত্যন্ত জটিল ও ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে এবং এই কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে দেশের অন্তত আরও ২ বছর সময় লাগতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আজ শনিবার (১৬ মে) দুপুরে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদে অবস্থিত মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের ১৮ তলা বিশিষ্ট নতুন ভবনের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দেশের অর্থনীতির এই বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ করার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এক বড় ধরনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। এই বৈশ্বিক সংকটের নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে দেশের জ্বালানি খাতে। তিনি তথ্য প্রকাশ করে জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাস খাতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বকেয়া এবং বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধে গত দুই মাসেই আরও প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে এই বিশাল ব্যয়ের বোঝা মাথায় নিয়ে দেশের জাতীয় অর্থনীতি এখনও গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তবে এই ঋণাত্মক অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে দেশকে বের করে আনতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী পূর্ববর্তী প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, আগের সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটের একটি বড় অংশই চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অপচয় হয়েছে। বর্তমান সরকার কেবল খাতভিত্তিক বরাদ্দ দিয়েই নিজের দায়িত্ব শেষ করবে না, বরং সেই জনগণের অর্থ যথাযথভাবে সঠিক খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা তাও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। অতীতে বিভিন্ন সরকারের আমলে দেশের মেডিকেল কলেজ ও স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অতিরিক্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এই ধরনের জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব ও স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে কোনো প্রকার অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ করবে না। অর্থমন্ত্রীর স্পষ্ট ভাষ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের মান ও সুশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু সেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রই এক দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে পূর্ণ সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান সরকার।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দেশের অনেক নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঐতিহাসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, মেধা ও যোগ্যতা ছাড়া কাউকে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানো মোটেও উচিত নয়; কারণ রাজনৈতিক বিবেচনায় ভর্তি করালে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মূল মান চিরতরে নষ্ট হয়। বিশেষ করে মেডিকেল শিক্ষার মান বজায় রাখতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সঠিক অনুপাত, পর্যাপ্ত দক্ষ ফ্যাকাল্টি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। এসব পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া কেবল আসনসংখ্যা বাড়ানো উচিত নয়। দেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া একটি অন্যতম মৌলিক অধিকার এবং দীর্ঘদিন দেশের মানুষ এই অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, বর্তমান সরকার সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে কাজ করছে। সরকারি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার কারণে দরিদ্র রোগীদের উন্নত চিকিৎসার স্বার্থে বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে একটি বিশেষ চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা হবে, যেখানে রোগীরা চিকিৎসা নিলে তার সম্পূর্ণ বিল সরকার নিজে পরিশোধ করবে।
মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, মাল্টিমিডিয়া সুবিধা, ডিজিটাল লাইব্রেরি, খেলাধুলা ও বিনোদনের উপযুক্ত ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্ব সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে, তাই মেডিকেল শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমানে দেশে দক্ষ মেডিকেল টেকনোলজিস্টের চরম ঘাটতি রয়েছে, যার ফলে দক্ষ জনবলের অভাবে হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এই সংকট দূর করতে তিনি দেশে দ্রুত মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ জোর দেন। উক্ত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে মা ও শিশু হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদের সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসকগণ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী হাসপাতালটির চলমান উন্নয়নমূলক কাজে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের আর্থিক ও নীতিগত সহযোগিতার পূর্ণ আশ্বাস প্রদান করেন।



