পরীক্ষামূলক সংস্করণ

লুটপাটের ঋণ আলাদা স্লটে রাখলে কমবে খেলাপি: বিশ্লেষকদের দাবি

অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক

দেশের ব্যাংকিং খাতে পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণের মধ্যে যে বিশাল অংশ লুণ্ঠন বা লুটপাটের শিকার হয়েছে, সেগুলোকে প্রচলিত খেলাপি ঋণের হিসাব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র স্লটে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

আজ শনিবার (১৬ মে) সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে সরকার ও আর্থিক খাতের নীতি-নির্ধারকদের উদ্দেশ্যে তারা এই উদ্ভাবনী ও বাস্তবমুখী পরামর্শ দেন। সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়, প্রেক্ষিত ইসলামী ব্যাংকিং সেক্টর: জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব ও উত্তরণের পথ’। বিশ্লেষকদের মতে, লুটপাটের ঋণ আলাদা স্লটে রেখে যদি ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত খেলাপির পরিমাণ কাগজে-কলমে কমিয়ে আনা যায়, তবে বর্তমানে তারল্য সংকটে ঝিমিয়ে পড়া ব্যাংকগুলোর নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সার্বিক সক্ষমতা ও গতি অনেক গুণ বৃদ্ধি পাবে। এই গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সম্মানিত উপদেষ্টা ও ব্র্যাকের বর্তমান চেয়ারপারসন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির স্বতন্ত্র পরিচালক ও ভাইস চেয়ারপারসন ফারুক মঈনউদ্দীন আহমেদ একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কারিগরি দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত দিনে যেসব ঋণ সরাসরি সুনির্দিষ্ট লুটপাটের শিকার হয়েছে, সেগুলোকে সাধারণ খেলাপি ঋণ থেকে অনতিবিলম্বে বাদ দেওয়া উচিত। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিটে খেলাপি ঋণের পাহাড় রাতারাতি কমে আসবে এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো হওয়ার পাশাপাশি তাদের নতুন করে ব্যবসা করার সক্ষমতা বাড়বে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এক্ষেত্রে বর্তমান নতুন সরকারের মানসিকতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ থাকলে এবং যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলে, ক্ষতিগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংকগুলো খুব দ্রুতই আবারও তাদের পূর্বের শক্তিশালী ও গৌরবময় অবস্থানে ফিরে যেতে সক্ষম হবে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর ওপর বিগত দিনে চালানো আগ্রাসনের নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন, প্রচলিত বা সাধারণ ধারার ব্যাংকের তুলনায় ইসলামী ব্যাংকগুলো থেকে অনেক বেশি পরিমাণে ঋণ বিতরণ করা যায়। আর ঠিক এই আইনি সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের লুটপাটের স্বার্থ চরিতার্থ করতেই একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল দেশের বড় বড় ইসলামী ব্যাংকগুলোকে পরিকল্পিতভাবে দখল ও কুক্ষিগত করার জন্য বেছে নিয়েছিল। পাশ্ববর্তী দেশের উদাহরণ টেনে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ১৯৯৩ সালেই খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। অথচ, বাংলাদেশে খেলাপি আইন করা হয়েছে অনেক পরে, ২০২৩ সালে। কিন্তু সেই আইনটিও পুরোপুরি বাস্তবধর্মী বা কঠোর ছিল না; বরং সেখানে অনেক আইনি ফাঁকফোকর বা গ্যাপ রাখা হয়েছিল। মূলত পূর্ববর্তী ফাসিস্ট আমলে বড় বড় করপোরেট গ্রুপগুলোকে অবাধে লুটপাটের আইনি সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্যেই ওই দুর্বল খেলাপি আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে বিশেষ অতিথির এই সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ও কৌশলকে জোরালো সমর্থন জানিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ঋণ খেলাপির যে বিশাল অংশটি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক লুটের শিকার হয়েছে, সেটিকে সাধারণ খেলাপির তালিকায় দীর্ঘ দিন ঝুলিয়ে না রেখে একটি আলাদা বিশেষ স্লটে স্থানান্তর করে মূল খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা উচিত। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান গভীর ক্ষত নিরাময়ে এটি একটি অত্যন্ত চমৎকার ও যুগান্তকারী উদ্ভাবনী সিদ্ধান্ত হতে পারে। এই সাহসী পদক্ষেপটি বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের সাধারণ গ্রাহক ও আমানতকারীদের মধ্যে ব্যাংকিং খাতের প্রতি হারানো আস্থা ও বিশ্বাস পুনরায় ফিরিয়ে আনতে তা অত্যন্ত অগ্রণী ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

অনুষ্ঠিত এই সেমিনারের সভাপতি হিসেবে স্বাগত ও সমাপনী বক্তব্য পেশ করেন ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক এবং এফবিসিসিআইয়ের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আবুল কাশেম হায়দার। তিনি তার বক্তব্যে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে পুরো দেশের ব্যাংকিং খাতে এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন বিপর্যয় ডেকে আনা হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই মহাসংকট মোকাবিলা করতে এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে ইতিমধ্যেই নানা ধরনের প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, মাঠপর্যায়ে সেই উদ্যোগগুলোর সুফল এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। তিনি অভিযোগ করেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের গত ১৫ বছরের শাসনামলে সরকারি কিংবা বেসরকারি— দেশের প্রায় সবকটি ব্যাংক থেকেই সমানতালে জনগণের আমানত লুণ্ঠন করা হয়েছে। তিনি আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বলেন, আমাদের দেশের দুটি বড় শিল্প গ্রুপ লুণ্ঠনের টাকায় আজ সিঙ্গাপুরে শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ীর তকমা ও স্বীকৃতি পেয়েছে। অথচ তারা যখন আমাদের নিজেদের দেশে ব্যবসা পরিচালনা করেছে, তখন দেশের ব্যাংকগুলোকে নির্মমভাবে দেউলিয়া ও লুণ্ঠন করেছে। এই লাগামহীন লুণ্ঠনের বিষময় ফলেই বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত এখন চরম ও তীব্র সংকটে ভুগছে। যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্পায়নে; ফলস্বরূপ গত দুই বছরে দেশে নতুন কোনো বড় শিল্পখাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ তো হয়ইনি, উল্টো কাঁচামাল ও তারল্য সংকটে দেশের তৈরি পোশাক খাতসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী খাতের অনেক নামী শিল্প কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।

উক্ত সেমিনারে দেশের ব্যাংকিং খাতের বিবর্তনের ওপর একটি অত্যন্ত তথ্যবহুল মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট গবেষক ও কলামিস্ট ড. মো. মিজানুর রহমান। তিনি তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে ঠিক ওই সময়ের শেষভাগ থেকেই ব্যাংকগুলোতে ধীরে ধীরে সুক্ষ্ম রাজনৈতিক প্রভাবের অশুভ সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংকগুলোতে সরাসরি ব্যবসায়িক আগ্রাসী প্রভাব বৃদ্ধি পায়, যার ফলে সুশাসনের চরম দুর্বলতা এবং কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ শুরু হয়। এরপর ২০০১ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংকগুলোতে পারিবারিক কেন্দ্রিক মালিকানা, চরম স্বজনপ্রীতি, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং করপোরেট-রাজনৈতিক যৌথ দখলদারিত্বের কালো অধ্যায় শুরু হয়। আর সবশেষে ২০১৩ সাল থেকে চতুর্থ প্রজন্মে এসে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় ও আত্মীয়তার খাতিরে ব্যাঙের ছাতার মতো নতুন নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে তীব্র তারল্য সংকট, নজিরবিহীন অর্থপাচার, গ্রাহকদের চরম আস্থাহীনতা এবং উচ্চ খেলাপির মতো মারাত্মক ঘটনা হু হু করে বৃদ্ধি পায়। আর এই চতুর্থ প্রজন্মের অন্ধকার সময়েই দেশের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী ব্যাংকগুলো পূর্ণমাত্রায় ফ্যাসিস্ট চক্রের সরাসরি দখলদারিত্ব ও লুণ্ঠনের শিকার হয়।

প্রধান খবর

গুলিতে নিহত যুবদল কর্মী/ কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়ার প্রত্যাশাতেই হত্যার নীল নকশার অভিযোগ

গত শুক্রবার ২৪ জুলাই রাজধানীর মিরপুরের কাফরুল এলাকায় গুলি করে যুবদলের কর্মী ইউসুফকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার পরবর্তী এক সংবাদ সন্মেলনে পুলিশের পক্ষ থেকে এলাকা আধিপত্য ও

আসছে...