অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক
বাংলাদেশকে বাদ দিয়েও ভারত চলতে পারবে বলে মন্তব্য করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান।
কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও খোলামেলা বক্তব্য প্রদান করেছেন। বিএনপির এই সংসদ সদস্য তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ভৌগোলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের চারদিকেই ভারতের অবস্থান। তাই ভারতকে আমাদের প্রয়োজন যেমন রয়েছে, তেমনি ভারতেরও বাংলাদেশকে প্রয়োজন। তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে, বাংলাদেশকে বাদ দিয়েও ভারত তার রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারবে বা চলতে পারবে। তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে সমমর্যাদার ভিত্তিতে দেখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা ভারতকে যেমন আমাদের প্রভু বা মনিব মানবো না, তেমনি আমরাও তাদের মনিব হবো না। মূলত দুই দেশেরই প্রয়োজন সমান এবং একটু হিসেব-নিকেশ ও বুঝেশুনে চললে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটি আরও সুন্দর হতে পারত।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে ফজলুর রহমান বলেন, আমরা হাজার হাজার বছর ধরে দুই বাংলায় এক ছিলাম। বঙ্গ, কলিঙ্গ, মগধসহ বিভিন্ন নামে এই বাংলাকে ডাকা হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে এর রাজধানী ছিল গৌড়, পান্ডুয়া, সোনারগাঁও, সপ্তগ্রাম ও বিক্রমপুর। পরবর্তীতে রাজধানী ঢাকায় এবং সেখান থেকে মুর্শিদাবাদ ও কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। কলকাতা টানা ১০০ বছর পুরো ভারতবর্ষের রাজধানী ছিল এবং তখন বাঙালিরাই পুরো ভারতবর্ষ শাসন করেছে। সেই সময়ে বাঙালির মেধা ও চিন্তার গভীরতা দেখে বিখ্যাত রাজনীতিবিদ গোপাল কৃষ্ণ গোখলে বলেছিলেন, ‘বাংলা আজকে যা ভাবে, বাকি ভারতবর্ষ তার একদিন পরে তা চিন্তা করে।’ কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, হিন্দু ও মুসলমানের সাম্প্রদায়িক ধর্মের ভিত্তিতে এই অবিভক্ত বাংলাকে ভাগ করা হয়েছিল। আর এই দেশভাগের পেছনে মূল কারিগর ছিলেন মহাত্মা গান্ধী এবং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এই দুই নেতার আদি বাড়ি ভারতের গুজরাটে ছিল এবং তারা নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক শত্রু ভাবাপন্ন হলেও বাংলাকে ধর্মের ভিত্তিতে দ্বিখণ্ডিত করার বিষয়ে একমত হয়েছিলেন।
দেশভাগের পরবর্তী জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা জানান, দেশভাগের সময় পূর্ব বাংলায় প্রায় ৩১ শতাংশ হিন্দু জনসংখ্যা ছিল। কিন্তু গত ৫০ বছরে এখান থেকে প্রায় ২২ শতাংশ হিন্দু অধিবাসী আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা কিংবা পশ্চিমবঙ্গে চলে গিয়েছেন, যা মোট হিন্দু জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। দেশান্তরি হয়ে তারা সেখানে উদ্বাস্তু জীবনযাপন করছেন। তবে সেই তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ বা আসামের মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ ও মালদা অঞ্চল থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মানুষ এ দেশে এই হারে আসেননি। ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা কমে ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩১ শতাংশ হয়েছে। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর থেকে ভারতের সাথে সম্পর্ক যেমনই হোক না কেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা আবার একটি অভিন্ন অক্ষে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই এ দেশের স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার ও আলবদর চক্রের একটি বিশেষ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে অনবরত তীব্র ভারত বিরোধী এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী প্রচারণা শুরু করে। তারা ভারত বিরোধিতা করতে গিয়ে মূলত হিন্দু ধর্মের বিরোধিতা করাকে একটি সাংঘাতিক রূপ দান করেছিল।
তিনি আরও বলেন, বিগত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ভারতের কলকাতা কেন্দ্রিক সহনশীল ও ধৈর্যশীল বাঙালিরা দেখছে যে, বাংলাদেশ যেন ক্রমান্বয়ে একটি উগ্রবাদী বা জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের ভালুকাসহ বিভিন্ন স্থানে হিন্দু হওয়ার কারণে মানুষকে গাছে তুলে আগুন দিয়ে মেরে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটছে। ফলে ওখানকার মানুষের মনেও তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে যে, বাংলাদেশে যদি হিন্দু মারা হয়, তবে তারা কেন সেখানে মুসলমানদের আঘাত করবে না। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, প্রতিটি অ্যাকশনের বা ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত রিঅ্যাকশন বা প্রতিক্রিয়া থাকে। বাংলাদেশের মানুষ বা পার্লামেন্ট থেকে যদি প্রতিদিন ‘দিল্লি না ঢাকা’ স্লোগান দেওয়া হয়, তবে ওপার থেকেও কলকাতার মানুষ ‘ঢাকা না কলকাতা’ স্লোগান তুলবে। একজনকে শত্রু মনে করলে অপরপক্ষও শত্রুভাবাপন্ন আচরণই করবে।
সাম্প্রদায়িকতাকে করোনার মতো একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ হিসেবে আখ্যায়িত করে ফজলুর রহমান বলেন, এই রোগ যেখানেই শুরু হয়, সেখান থেকেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে যদি জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি পায়, তবে ভারতেও এর রিঅ্যাকশন হবে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলঙ্কা আন্দোলনের পর সুন্দরভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, নেপালে ১৮ বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও তাদের অর্থনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হয়নি এবং সেখানে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি ভুটানও খুব সুন্দরভাবে তাদের রাষ্ট্র চালাচ্ছে। কিন্তু যত গণ্ডগোল ও অস্থিরতা শুধু আমাদের এখানে তৈরি হয়েছে এবং আমরা সারাক্ষণ ভারত নিয়ে আর ভারত আমাদের নিয়ে পড়ে আছি। এই পুরো সংকটের জন্য সব জায়গার সাম্প্রদায়িক শক্তিই দায়ী। আমরা নিজেরা খুব ভালো মানুষ আর শুধু ভারতের পশ্চিমবঙ্গেই সাম্প্রদায়িকতা হচ্ছে—এমন ভাবার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই বাংলাদেশে বর্তমানে যে মাত্রায় জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা চলছে, তা কল্পনাতীত এবং এটি আমাদের একটি বড় ব্যর্থতা। ১৯৭২ সাল থেকেই অত্যন্ত গোপনে ভারত বিরোধী যে প্রচারণার বীজ বপন করা হয়েছিল, তা আজ সোচ্চার রূপ নিয়েছে। যদিও ভারত আমাদের থেকে আসলে কতটুকু নিয়ে গেছে, তা স্পষ্ট নয়



