সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে ৪১ লাখ নারীর জন্য ফ্যামিলি কার্ডে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ভাতা বৃদ্ধির বিশেষ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ১১ জুন বিকেলে জাতীয় সংসদে স্পিকার ডক্টর হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেন। পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অধিবেশনের আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে এই বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর এটিই বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট। দেশের ইতিহাসে ১৯৭২ সালে মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পাঁচ দশকের ব্যবধানে এবারের বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যেখানে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের বা জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকার বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে, যার মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে। নতুন এই বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনা, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়া।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রী নতুন বাজেটে একাধিক যুগান্তকারী সামাজিক সুরক্ষা খাত ঘোষণা করেছেন। সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক উদ্বোধিত সরকারের ‘সিগনেচার’ কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাইলট প্রকল্প থেকে দেশব্যাপী সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীকে এর আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই খাতে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে পরিবারের প্রধান নারী প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এটি সম্পূর্ণ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি চলমান বয়স্ক ভাতা এবং বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীদের ভাতা কর্মসূচিও অব্যাহত থাকবে। দেশের প্রবীণদের সম্মানার্থে আরও একটি বড় ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে প্রবীণ নাগরিকেরা এখন থেকে ট্রেন ভ্রমণে শতভাগ ফ্রি বা বিনামূল্যে যাতায়াত করতে পারবেন এবং মেট্রোরেল ভাড়ায় পাবেন ২৫ শতাংশ ছাড়।
একই সাথে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বাজেটে বরাদ্দ ও ভাতাভোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষার আওতায় প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা ৩৮ লাখে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে তাদের মাসিক ভাতা হবে ১ হাজার টাকা। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ভাতাভোগীর সংখ্যা ১ লাখে উন্নীত করার পাশাপাশি শিক্ষার স্তরভেদে মাসিক ভাতা ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। মা-শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ১৮ লাখ ৯৫ হাজার মা ও শিশুকে প্রতি মাসে ৮৫০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এ ছাড়া ক্যানসার, কিডনি রোগসহ ছয়টি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য চলমান এককালীন আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা থেকে এক লাফে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করার মানবিক প্রস্তাব রাখা হয়েছে এই নতুন বাজেটে।



