পরীক্ষামূলক সংস্করণ

বাঙালি মুসলিমদের জোর করে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে ভারত

কোনো ধরনের মৌলিক বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য থেকে মূলত বাঙালি মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তথ্য প্রকাশ করেছে।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) এই জোরপূর্বক পুশব্যাকের পদক্ষেপ এবং বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) অবৈধ প্রবেশ ঠেকানোর কঠোর অবস্থানের কারণে দুই দেশের মধ্যবর্তীশূন্য রেখাবানো ম্যানস ল্যান্ড’- বহু পরিবার মানবেতরভাবে আটকে পড়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে এখন পর্যন্ত তারা বিএসএফের এমন ২১টি পুশব্যাকের চেষ্টা সফলভাবে ব্যর্থ করে দিয়েছে। এসব প্রচেষ্টায় শিশুসহ শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশের সীমান্ত জেলাগুলোতে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গত মার্চে নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয়ী হওয়ার পর দায়িত্ব গ্রহণ করে বলেন, তারডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্টনীতির অধীনে শত শতবাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে আটক করা হয়েছে এবং প্রায় হাজার মানুষকেফিরে যেতেবাধ্য করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে তাদের মৌলিক মানবাধিকার উপেক্ষা করে নিষ্ঠুরভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বা সীমান্তে আটকে রাখছে। সরকারকে অবৈধভাবে মানুষ বহিষ্কার বন্ধ করতে হবে, প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নাগরিকত্ব যাচাই করতে হবে এবং মুসলিমদের প্রতি এই উদ্বেগজনক বৈরিতা বন্ধ করতে হবে।হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই ঘটনার শিকার মোট নয়জন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখতে পেয়েছে যে, ভারতীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী রাতের আঁধারে একদল মানুষকে সীমান্তে নিয়ে এসে কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে জোর করে বাংলাদেশি ভূখণ্ডে ঠেলে দেয়। তবে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষীরা তাদের দেশের ভেতরে প্রবেশ করতে না দিলে বিএসএফ শেষ পর্যন্ত তাদের আবার ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত জেলা পঞ্চগড়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গত জুন বিএসএফ শিশুসহ ১০ জন বাঙালি মুসলিমকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে টানা ৭৫ ঘণ্টার এক দীর্ঘ টানাপোড়েন তৈরি হয়। এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী পঞ্চগড়ের স্থানীয় বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী রুবেল হোসেন বলেন, “দলটি বাংলাদেশের ভূখণ্ডের প্রায় ৫০ ফুট ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। স্থানীয়রা বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষীদের খবর দেয় এবং বাহিনী আসার পর তারা পিছু হটে একটি বাঁধের ওপরনো ম্যানস ল্যান্ড’- অবস্থান নেয়। প্রথম রাতে ওই আটকে পড়া দলটি ভয়াবহ বজ্রপাত ভারী বৃষ্টির মধ্যে পড়ে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা দ্বিতীয় দিন কিছু শুকনো খাবার দেয়।রুবেল হোসেন সীমান্তে দুই বাহিনীর অবস্থান বর্ণনা করে আরও বলেন, “আমি যা দেখেছি তা ছিল এক ধরনের যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি, যেখানে বিএসএফ বিজিবি উভয় বাহিনীর বড় ধরনের মোতায়েন ছিল। সীমান্তে একাধিকপতাকা বৈঠক’ (দুই বাহিনীর স্থানীয় পর্যায়ের আলোচনা) ব্যর্থ হয়, পরে বিএসএফ শেষ পর্যন্ত দলটিকে ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

একইভাবে গত জুন ভোরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা দুটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের তিন পুরুষ, দুই নারী একটি শিশুসহ মোট ছয়জন সদস্যকে বাংলাদেশের তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়। বিজিবি তাদের প্রবেশ আটকে দিলে বিএসএফ তাদের ভারতে ফেরত যেতে দেয়নি, ফলে পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে সীমান্তে আটকে পড়ে রাত কাটায়। পরবর্তীতে ভারতীয় পক্ষ তাদের ফেরত নেয়। এরপর জুন বিজিবি জানায়, বিএসএফ এক গর্ভবতী মা তার শিশুসহ মোট ১১ জনকে প্রায় ৪৮ ঘণ্টাশূন্য রেখায়আটকে রাখার পর আবার ভারতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগেই ভারতের নির্বাচন কমিশন দ্রুত বিতর্কিতভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন করে ৯০ লাখেরও বেশি মানুষের নাম বাদ দেয়, যা এই ব্যাপক আটক বহিষ্কারের হুমকি তৈরি করেছে। এর আগে ২০১৯ সালে ভারতের আসাম রাজ্যে একটি ত্রুটিপূর্ণ বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার ফলে ১৯ লাখেরও বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে এবং হাজার হাজার বাঙালি ভাষাভাষী মানুষকে আটক শিবিরে রাখার পাশাপাশি অনেককে অবৈধভাবে বহিষ্কার করা হয়।

আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রাজ্যে বসবাসকারী বাংলাভাষী মুসলমানদের বারবার আক্রমণ করে তাদেরঅবৈধ অভিবাসীবলে অভিহিত করেছেন। সম্প্রতি তিনি বলেন, “আমরা তাদের সীমান্তের কাছাকাছি একটি সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে যাই এবং সত্যি বলতে তাদের জোর করে সীমান্ত পার করিয়ে দিই। এখন আসামে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে বহু অবৈধ বাংলাদেশি নিজেরাই স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে শুরু করেছে।তবে বাংলাদেশের পঞ্চগড় সদর উপজেলার একটি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাসিবুর ইসলাম জানান, তিনি পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে আসা সীমান্তে আটকে পড়া একটি পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন যারা তাকে জানায় যে তাদের কাছে ভারতের বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্রআধার কার্ডছিল। কিন্তু সংশোধিত ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় পুলিশ তাদের আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দেয়। ওই পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য এর আগে চারবার ভারতে ভোট দিলেও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় এবার ভোট দিতে পারেননি। পরিবারটি সীমান্তে তিন দিন আটকে থাকার পর আবার ভারতে ফিরে যেতে সক্ষম হয়।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করছে যে বহু বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছে এবং তাদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরাতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্পষ্ট করেছে যে সত্যিকারের স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও ভারত কোনোভাবেই জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন বা জোর করে বহিষ্কার করতে পারে না। তাছাড়া মানুষকে তাদের নথিপত্র, অর্থ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র থেকে বঞ্চিত করাও সম্পূর্ণ বেআইনি। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এলাকায় শত শত কথিত অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটক করে হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছে, যাদের মধ্যে অধিকাংশ মুসলিম এবং কিছু হিন্দুও আছেন। একজন ভারতীয় অধিকারকর্মী জানান, সীমান্ত এলাকার হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে আনুমানিক ৪০০ জনকে আটকে রাখা হয়েছে, যেখানে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়াটাই এখন গ্রেপ্তারের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো সঠিক আইনি প্রতিষ্ঠিত যাচাই প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত দিয়ে জোর করে ঠেলে পাঠানো কোনো মানুষকে তারা গ্রহণ করবে না। ভারত আন্তর্জাতিক নাগরিক রাজনৈতিক অধিকার সনদ এবং জাতিগত বৈষম্য বিলোপ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনের অধীনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে বলা হয়েছে জাতি বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, শিশুদের বহিষ্কার বা সীমান্তে আটকে রাখাশিশু অধিকার সনদ’-এর চরম লঙ্ঘন। ভারত বাংলাদেশের মধ্যে জাতীয়তা যাচাইয়ের দ্বিপাক্ষিক আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও বিএসএফ তা পাশ কাটিয়ে মানুষকে সীমান্তে ঠেলে দিচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মীনাক্ষী গাঙ্গুলি পরিশেষে বলেন, “জাতীয়তা যাই হোক না কেন, কাউকে দুই সারি সশস্ত্র সীমান্তরক্ষীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়। ভারতকে এই নির্মম বহিষ্কার বন্ধ করতে হবে এবং দুই সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে যেন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আর কখনো মৌলিক মানবিক মর্যাদার মূল্য দিয়ে না হয়।

প্রধান খবর

কমলাপুর রেলস্টেশনে নিয়মিত যৌথ অভিযান চালাবে র‍্যাব ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ

মুনতাসীর মামুন : টিকিট কালোবাজারি, মাদক ও চোরাচালান বন্ধে টাউনহল সভায় সিদ্ধান্ত রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন ও আশপাশের এলাকায় টিকিট কালোবাজারি, মাদক ও চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে নিয়মিত যৌথ অভিযান চালাবে

আসছে...