দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আগামী ২৮ জুন, ২০২৬ (রবিবার) থেকে বাংলাদেশের ৫টি কেন্দ্রে (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনা) নতুন নিয়মে ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন জমা নেওয়া শুরু হচ্ছে। ১ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিসা দেওয়া হবে। বিগত দিনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা স্লট বুকিং জালিয়াতি এবং দালালদের কোটি কোটি টাকার কালোবাজারি রুখতে এবার সম্পূর্ণ নতুন ও কঠোর প্রযুক্তিগত নিয়ম চালু করেছে ভারতীয় ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার (IVAC)।
কী এই নতুন নিয়ম?
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রার্থীরা যেদিন আইভ্যাক সেন্টারে কাগজপত্র জমা দিতে চান, তার ঠিক আগের দিন দুপুর ২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে IVAC-এর পোর্টালে সাইন-আপ করে মূল ভিসা আবেদনপত্রের পিডিএফ ফাইলটি আপলোড করতে হবে। সাইন-আপের সময় প্রার্থীর নিজস্ব ইমেইল ও মোবাইল নম্বরে ওটিপি) আসবে, যা দিয়ে ভেরিফাই করা বাধ্যতামূলক। এরপর বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে যারা সফলভাবে ফাইল আপলোড সম্পন্ন করবেন, তাদের জন্য ঠিক সন্ধ্যা ৬টায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট উন্মুক্ত করা হবে এবং প্রার্থীরা পরবর্তী দিনের জন্য স্লট নিশ্চিত করবেন।
আইভ্যাক-এর এই নতুন নিয়মের কারণে পুরোনো স্বয়ংক্রিয় ‘বট’ বা ‘ডামি পাসপোর্ট নম্বর’ দিয়ে আগে থেকে স্লট ব্লক করে রাখার জালিয়াতি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তবে সাইবার security বিশেষজ্ঞ ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জালিয়াতি চক্রটি বসে নেই। তারা নতুন নিয়মের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে ইতিমধ্যেই ভিন্ন কৌশলে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নতুন নিয়মে দালাল চক্রের সম্ভাব্য ৩টি কৌশল
১. ওটিপি ও ফাইল জিম্মি করা :যেহেতু নতুন নিয়মে রিয়েল-টাইম ওটিপি ভেরিফিকেশন এবং মূল আবেদনপত্রের পিডিএফ আপলোড করা বাধ্যতামূলক, তাই দালালরা এখন আর নিজে থেকে ভুয়া স্লট তৈরি করতে পারবে না। তারা এখন টার্গেট করবে সেইসব সাধারণ মানুষদের, যারা প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ নন বা নিজে ফাইল আপলোড করতে পারেন না। আইভ্যাক-এর আশেপাশের কম্পিউটার দোকান বা ফেসবুলের দালালরা সাধারণ মানুষের নাম ও মোবাইল ব্যবহার করে দুপুর ২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে ফাইল আপলোড করে দেবে। কিন্তু সন্ধ্যা ৬টার ঠিক আগে, যখন চূড়ান্ত স্লট কনফার্ম করার সময় আসবে, তখন প্রার্থীর মোবাইলে যাওয়া ওটিপি কোডটি নেওয়ার জন্য বা স্লট কনফার্ম করে দেওয়ার বিনিময়ে ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা দাবি করবে। টাকা না দিলে ফাইলটি ওখানেই জিম্মি হয়ে থাকবে এবং প্রার্থী পরবর্তী দিনের স্লট হারাবেন।
২. হাই-স্পিড ‘ক্লিকার’ স্ক্রিপ্ট:
বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত যত মানুষ সফলভাবে ফাইল আপলোড করবেন, তাদের সবার জন্য ঠিক সন্ধ্যা ৬টায় স্লট ওপেন করা হবে। এখানে তৈরি হবে তীব্র প্রতিযোগিতা (High Traffic)। দালালরা সাধারণ প্রার্থীদের তুলনায় দ্রুত কাজ করার জন্য বিশেষ কাস্টম ব্রাউজার এক্সটেনশন বা ‘হাই-স্পিড ক্লিকার স্ক্রিপ্ট’ ব্যবহার করবে। সন্ধ্যা ৬টা বাজার সাথে সাথে এই স্ক্রিপ্টগুলো মানুষের হাতের চেয়ে হাজার গুণ দ্রুত ক্লিক করে প্রার্থীর অ্যাকাউন্ট থেকে স্লটটি কনফার্ম করে দেবে। অর্থাৎ, দালালদের মাধ্যমে লগইন না করলে সাধারণ মানুষ নিজে চেষ্টা করে “সার্ভার বিজি” বা “স্লট নট অ্যাভেলেবল” দেখতে পারেন।
৩. ভুয়া ওটিপি লিংক ও ফিশিং পেইজ :
নতুন নিয়ম চালুর সুযোগ নিয়ে ফেসবুকে বা মেসেঞ্জারে আইভ্যাক-এর ক্লোন বা ভুয়া ওয়েবসাইট বানিয়ে ছড়ানো হতে পারে। সাধারণ মানুষ ওটিপি পাওয়ার লোভে বা ফাইল আপলোডের সহজ উপায়ের খোঁজে ওইসব ভুয়া লিংকে ক্লিক করলে তাদের পাসপোর্টের মূল পিডিএফ ফাইল এবং ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য চুরি হওয়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে।
আর্থিক খতিয়ান: নতুন মেকানিজমেও কোটি টাকার বাণিজ্য
যদি প্রতিদিন ৫টি কেন্দ্রে গড়ে ৪,০০০ প্রার্থীও নিজে ফাইল আপলোড করতে না পেরে বা সন্ধ্যা ৬টার তীব্র ট্রাফিকের ভয়ে দালালদের শরণাপন্ন হন, এবং প্রতি স্লটের জন্য দালালরা গড়ে ৫,০০০ টাকাও হাতিয়ে নেয়; তবে দৈনিক অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়াবে:
৪,০০০ * ৫,০০০ = ২,০০,০০,০০০ টাকা (২কোটি টাকা)
আইভ্যাক-এর সাপ্তাহিক কার্যদিবস (রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার) অনুযায়ী মাসে গড়ে ২২টি কর্মদিবস হিসাব করলে, মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি না থাকলে প্রতি মাসে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে অন্তত ৪৪ কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালানোর সুযোগ থেকে যাবে এই চক্রের।
সাধারণ ভিসা প্রার্থীদের জন্য জরুরি সতর্কতা ও করণীয়
ভিসা প্রক্রিয়া নতুন করে চালুর এই সময়ে কোনো প্রকার প্রতারণা ও আর্থিক ক্ষতি এড়াতে সাইবার বিশেষজ্ঞরা প্রার্থীদের নিচের নির্দেশনাসমূহ কঠোরভাবে মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন:
• নিজের ফাইল নিজেই আপলোড করুন: দুপুর ২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে নিজের কম্পিউটার বা স্মার্টফোন ব্যবহার করে নিজেই ভিসা আবেদনপত্রের পিডিএফ ফাইলটি আপলোড করুন। বাইরের কোনো কম্পিউটার অপারেটর বা অপরিচিত কাউকে এই দায়িত্ব দেবেন না।
• ওটিপি (OTP) গোপন রাখুন: আপনার মোবাইল বা ইমেইলে আসা ওটিপি (OTP) কোডটি কখনোই কোনো অপরিচিত ব্যক্তি, ফেসবুকের দালাল বা বাইরের দোকানদারকে জানাবেন না। সন্ধ্যা ৬টায় স্লট নিশ্চিতকরণের সময় এটি আপনার নিজেরই প্রয়োজন হবে।
• অফিশিয়াল পোর্টাল ছাড়া কোথাও তথ্য দেবেন না: শুধুমাত্র আইভ্যাক-এর নির্ধারিত অফিশিয়াল পোর্টাল ব্যবহার করুন। কোনো থার্ড-পার্টি অ্যাপ বা ফেসবুক পেজে আপনার পাসপোর্টের কপি বা ব্যক্তিগত ফাইল শেয়ার করবেন না।
বিশেষজ্ঞ মতামত:
আইভ্যাক-এর নতুন এই ডিজিটাল পদক্ষেপটি জালিয়াতি চক্রের পুরোনো সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার জন্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে ২৮ জুন থেকে এই প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি সফল করতে হলে শুধু অনলাইন নিরাপত্তা বাড়ালেই হবে না, আইভ্যাক সেন্টারের আশেপাশের কম্পিউটার দোকানগুলোর ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর সিসিটিভি নজরদারি এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা জরুরি, যাতে কেউ ওটিপি বা ফাইল জিম্মি করে টাকা হাতিয়ে নিতে না পারে।



