বৈশ্বিক অপরাধের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, দূতাবাসের নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ।সোমবার (২৯ জুন) সকালে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ‘ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি কোঅপারেশন, ইনফরমেশন শেয়ারিং অ্যান্ড ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অব বাংলাদেশ পুলিশ’ (কূটনৈতিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় এবং বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি) শীর্ষক একটি বিশেষ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈশ্বিক অপরাধের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমনে কূটনৈতিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি, কার্যকর তথ্য বিনিময় ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদারের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো এই আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিদেশি কূটনীতিকগণ বাংলাদেশ পুলিশের এই ব্যতিক্রমী ও সময়োপযোগী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে যৌথভাবে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমন্বয় সভায় প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। সভায় ঢাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতগণ, দূতাবাসের নিরাপত্তা কর্মকর্তাগণ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই উপস্থিত অতিথিদের সামনে বাংলাদেশ পুলিশের সার্বিক কার্যক্রম ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার ওপর একটি তথ্যবহুল ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
সমন্বয় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি বেলাল উদ্দিন। উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অপরাধের ধারণা অনেক বিস্তৃত ও জটিল হয়ে উঠছে। সহিংস উগ্রবাদ ও সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ আজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাইবার অপরাধ ও ডিজিটাল জালিয়াতি। সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থায়ন, মানব পাচার, অনলাইন জুয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর অপরাধ, ডিপফেক, ভুল তথ্য ও অপতথ্য ছড়ানো আজ আর কোনো একক দেশের সমস্যা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে বিবেচিত। আধুনিক পুলিশিংয়ের বর্তমান বাস্তবতা হলো, অপরাধ তদন্তে একাধিক বিচার ব্যবস্থা, বিদেশী নাগরিক, সীমান্তপারের লেনদেন এবং জটিল আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক জড়িত থাকে। এসব অপরাধ মোকাবেলায় শক্তিশালী কূটনৈতিক অংশীদারিত্ব এখন আর বিকল্প নয়, বরং এটি আজ অপরিহার্য।
বাংলাদেশ পুলিশে ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সমন্বয়ে এক বিস্তৃত কাঠামো গড়ে উঠেছে। পুলিশ সদরদপ্তর ‘ওভারসিজ অ্যাফেয়ার্স শাখা, এনসিবি ও ইউএন অপারেশন শাখা, ডিএমপি, এসবি, সিআইডি, পিবিআই এবং এটিইউ’র মাধ্যমে আন্তর্জাতিক তদন্তে নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রে অসাধারণ পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক তদন্ত এবং কূটনৈতিক সম্পৃক্ততায় বাংলাদেশ পুলিশের অনন্য অবদান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ পুলিশ অপরাধ দমনে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো, কার্যকর তথ্য বিনিময় এবং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মু. নজরুল ইসলাম কূটনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার এবং বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা বাড়াতে বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, “বাংলাদেশ পুলিশের ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি ডিভিশন কূটনীতিকদের নিরাপত্তায় প্রশংসনীয় অবদান রাখছে।” তিনি বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ পুলিশের এ আয়োজনকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে অতিথিদের নিরাপত্তা বিষয়ক সহযোগিতা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, “বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সমন্বয়, তথ্য বিনিময় ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রায় কঠিন।” তিনি দেশের বাইরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশ অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছে উল্লেখ করে বলেন, সাইবার ক্রাইম, ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম, ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমসহ বৈশ্বিক অপরাধ মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তুলতেও পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে।
সভাপতির বক্তব্যে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, “বাংলাদেশ পুলিশ শুধু অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থারও এক নির্ভরযোগ্য অংশীদার। ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি বাংলাদেশ পুলিশের অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।” তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বে কার্যকর পুলিশিং নির্ভর করে ফলপ্রসূ সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে গভীর সহযোগিতা ও সমন্বয়ের ওপর।
সভার শেষভাগে মূল প্রবন্ধের ওপর একটি উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষে পুলিশ সদরদপ্তরের ডিআইজি মো. কামরুল আহসান, ডিআইজি তাপতুন নাসরীন এবং জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এর অতিরিক্ত ডিআইজি মহিউল ইসলাম অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত প্রশ্নের জবাব দেন। সভায় মানি লন্ডারিং, ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম, সাইবার ক্রাইম, মানব পাচার ইত্যাদি বহুমাত্রিক অপরাধ মোকাবেলা এবং তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে বলে সর্বসম্মত সুপারিশ করা হয়।



