বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কক্সবাজারের মহেশখালী ও কুতুবদিয়া দ্বীপ উপজেলার রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে দেওয়া দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়া, পরিচালন ব্যয় এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে আছে, যার ফলে দুই দ্বীপের বাসিন্দারা নৌপথে চরম জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
ঘটনার পটভূমি ও বর্তমান পরিস্থিতি কক্সবাজার জেলার দুটি দুর্গম দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী ও কুতুবদিয়া। এই অঞ্চলের সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত এবং নিরাপদে জেলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দুটি আধুনিক সি-অ্যাম্বুলেন্স প্রদান করা হয়েছিল। তবে তিন বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে এই সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে পরিচালন ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণের চরম সংকটে পড়ে কোটি কোটি টাকার অ্যাম্বুলেন্স দুটি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। এর ফলে দুই দ্বীপ উপজেলার কয়েক লাখ বাসিন্দা উন্নত ও জরুরি চিকিৎসার জন্য আবারও পূর্বের মতোই অনিরাপদ কাঠের ট্রলার এবং সাধারণ নৌযানের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয়দের ভোগান্তি ও ভৌগোলিক দূরত্ব স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, বিশেষ করে রাত-বিরাতে মুমূর্ষু ও প্রসূতি রোগীদের জেলা সদর কক্সবাজারে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং সাধারণ নৌযানের তীব্র সংকটের কারণে রোগীদের জীবনের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। মহেশখালী থেকে কক্সবাজারের নৌপথের দূরত্ব ৮ কিলোমিটার এবং কুতুবদিয়া থেকে জেলা সদরে যাওয়ার নৌপথের দূরত্ব সাড়ে ৩ কিলোমিটার। কুতুবদিয়ার ৬টি ইউনিয়নে প্রায় ২ লাখ মানুষের বসবাস। সেখানে ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ১২টি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও উন্নত চিকিৎসা সুবিধার অভাবে জটিল রোগীদের সাগরপথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারে যেতে হয়। রাতের বেলায় জটিল রোগীদের জেলা সদরে পৌঁছাতে কোনো সাধারণ নৌযানও খুঁজে পাওয়া যায় না।
অ্যাম্বুলেন্স প্রাপ্তির উৎস ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেওয়া সি-অ্যাম্বুলেন্সটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্থানীয় সরকার সহায়তা প্রকল্প (এলজিএসপি) এর মাধ্যমে এবং কুতুবদিয়ার সি-অ্যাম্বুলেন্সটি বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা রিসার্চ ট্রেনিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ইন্টারন্যাশনালের (আরটিএমআই) মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছিল। এই নৌ-অ্যাম্বুলেন্স দুটি আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে ক্রয় করা হয়। পরবর্তীতে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মাধ্যমে এগুলোকে সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছিল।
কক্সবাজারের সিভিল সার্জনের বক্তব্য কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের এই বিষয়ে বলেন, ‘২০১৭ সালে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এলজিএসপি প্রকল্পের আওতায় চালক, সহকারী, জ্বালানি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করা হতো। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্স দুটি সচল রাখা যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সি-অ্যাম্বুলেন্স দুটি সচল রাখতে নতুন প্রকল্প বা বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। আবারও চিঠি দেওয়া হবে। পাশাপাশি আইএসও প্রকল্পের আওতায় পরিচালনার সুযোগ আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
মহেশখালী উপজেলার চিকিৎসাসেবার পরিসংখ্যান ও অ্যাম্বুলেন্সের বর্তমান দশা মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সূত্রমতে, মহেশখালী-কক্সবাজার ৮ কিলোমিটার নৌপথে রোগী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত সি-অ্যাম্বুলেন্সটি ২০২৩ সালের মে মাসে সরবরাহ করা হয়েছিল। চালুর পর ২০২৩ সালে ৮৫ জন এবং ২০২৪ সালে ১৭৯ জন রোগীকে এই অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে কক্সবাজারে আনা-নেওয়া করা হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. ফাহিম শাহরিয়ার শাওন চিকিৎসাসেবার পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজারে রেফার করতে হয়। এর মধ্যে মুমূর্ষু ও জটিল গাইনি রোগীও থাকে। অনেক সময় রাতের বেলায় সিজারিয়ান রোগীকেও পাঠাতে হয়।’
বর্তমানে সরেজমিনে দেখা গেছে, মহেশখালী জেটিঘাটের পূর্বপাশের খালে নোঙর করে রাখা সি-অ্যাম্বুলেন্সটি জোয়ারের পানিতে ভাসে এবং ভাটায় কাদার মধ্যে আটকে পড়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে চরম অবহেলায় পড়ে থাকলেও এটি দেখভালের জন্য কোনো জনবল নেই।
মহেশখালীর স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কারিগরি বিবরণ ও চিঠি চালাচালি মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহফুজুল ইসলাম অ্যাম্বুলেন্সটির কারিগরি ও খরচের বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সটিতে ১৫০ লিটার অকটেন ও ৫ লিটার মবিল দিলে চারবার যাওয়া-আসা করা যায়। একবার যাওয়া-আসার খরচ প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। এটি একসঙ্গে ৮ থেকে ১০ জন রোগী বহন করতে সক্ষম। এটি ৪০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন। তবে অ্যাম্বুলেন্সটি ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর আর চালু রাখা যায়নি।’
তিনি আরও জানান, অ্যাম্বুলেন্সটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ইনক্লুসিভ সার্ভিসেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ (আইএসও) প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করতে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে পরিচালন ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়ার কারণে এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে চলতি জুলাই মাসে এ বিষয়ে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করছেন।
মহেশখালীর স্থানীয় বাসিন্দার বক্তব্য মহেশখালীর স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুব রোকন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দ্বীপ এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা এখনও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে সি-অ্যাম্বুলেন্স বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় জটিল রোগীদের জেলা সদরে পৌঁছাতে কোনো নৌযানও পাওয়া যায় না।’
কুতুবদিয়ার সি-অ্যাম্বুলেন্সের করুণ দশা ও নিমজ্জন কুতুবদিয়া উপজেলায় বরাদ্দকৃত সি-অ্যাম্বুলেন্সটির অবস্থা আরও ভয়াবহ ও শোচনীয়। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকার পর চলতি ২০২৬ সালের মে মাসে বড়ঘোপ ঘাটে জোয়ারের পানিতে সেটি সম্পূর্ণ তলিয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অ্যাম্বুলেন্সটি জনগণের কোনো কাজেই আসেনি। জ্বালানি ও জনবল সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্সটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।
বড়ঘোপ জেটিঘাটের টোল আদায়ের দায়িত্বে থাকা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সটি কার্যত কখনোই জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা দিতে পারেনি। এটি এখন কেউ দেখাশোনাও করে না।’

কুতুবদিয়ার স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বক্তব্য ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অনীহা কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল হাসান এই সংকটের বিষয়ে বলেন, ‘সাড়ে তিন বছর আগে একটি ঘূর্ণিঝড়ে অ্যাম্বুলেন্সটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে সরবরাহকারী সংস্থা সেটি সংস্কার করে দেয়। বর্তমানে এর ব্যাটারির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।’
তিনি আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে আরও বলেন, ‘গত জাতীয় নির্বাচনের সময় নৌবাহিনী অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহার করতে চেয়েছিল, কিন্তু সেটি অকেজো থাকায় ব্যবহার সম্ভব হয়নি। একবার যাওয়া-আসায় প্রায় পাঁচ হাজার টাকার জ্বালানি প্রয়োজন হয়, এ ব্যয় বহন করা আমাদের পক্ষে কঠিন। গত ডিসেম্বর মাসে বিশ্বব্যাংক, আইওএম ও ইউনিসেফকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারা নতুন করে অর্থায়নে আগ্রহ দেখায়নি।’
বিশেষজ্ঞদের মত ও নাগরিক সমাজের দাবি দ্বীপ অঞ্চলের এই মানবিক সংকটের বিষয়ে কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করে বলেন, ‘কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা সি-অ্যাম্বুলেন্সগুলো দ্রুত সচল করা হোক। অন্যথায় জরুরি চিকিৎসাসেবার অভাবে দ্বীপাঞ্চলের মানুষের জীবনঝুঁকি আরও বাড়বে।’



