মুনতাসীর মামুন
বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে চলমান আলোচনায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি অন্যতম আলোচিত বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক বা সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে বিবেচিত হলেও নতুন সংস্কার প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীন ক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তবে এসব পরিবর্তন কার্যকর হতে হলে সংবিধান সংশোধনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে।
বর্তমানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কী?
বর্তমান সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেন। ব্যতিক্রম হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধানে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।
বর্তমানে রাষ্ট্রপতির প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পড়ানো।
- মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগ।
- প্রধান বিচারপতি নিয়োগ।
- সংসদ অধিবেশন আহ্বান ও মুলতবি ঘোষণা।
- সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি প্রদান।
- সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন।
- বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের পরিচয়পত্র গ্রহণ।
- সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ক্ষমা, দণ্ড স্থগিত বা লঘু করার ক্ষমতা।

কী কী ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে?
সংবিধান সংস্কার নিয়ে আলোচনায় রাষ্ট্রপতির জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন ক্ষমতার প্রস্তাব এসেছে।
১. সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে স্বাধীন ভূমিকা
বর্তমানে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ সরকারের সুপারিশে হয়ে থাকে। প্রস্তাব অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে বা নির্দিষ্ট কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে কয়েকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগ দিতে পারবেন। সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে
- দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)
- জাতীয় মানবাধিকার কমিশন
- নির্বাচন কমিশনের কিছু নিয়োগ কাঠামো
- অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান (চূড়ান্ত আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে)।
২. প্রধানমন্ত্রীকে ভারসাম্যে রাখার সাংবিধানিক ভূমিকা
সংস্কার প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতিকে কিছু ক্ষেত্রে “চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স” নিশ্চিত করার সাংবিধানিক ভূমিকা দেওয়ার আলোচনা হয়েছে, যাতে নির্বাহী ক্ষমতা এককভাবে কেন্দ্রীভূত না হয়।
৩. সরাসরি নির্বাচনের আলোচনা
সংস্কার কমিশনের আলোচনায় রাষ্ট্রপতিকে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত করার প্রস্তাবও উঠে এসেছে। যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঐকমত্য হয়নি।
৪. গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে মতামত দেওয়ার সুযোগ
রাষ্ট্রপতিকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নিয়োগে স্বাধীন মতামত বা অনুমোদনের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
- রাষ্ট্রপতির যেসব ক্ষমতা অপরিবর্তিত থাকবে
- সংস্কার হলেও কিছু মৌলিক দায়িত্ব আগের মতোই থাকবে—
- রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান।
- সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক।
- বিদেশি রাষ্ট্রদূত গ্রহণ।
- রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান।
- দণ্ড মওকুফ বা লঘু করার ক্ষমতা।
সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া কী?
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের মোট সদস্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে সংবিধান সংশোধন বিল পাস হতে হবে। এরপর বিল রাষ্ট্রপতির কাছে গেলে তিনি সাত দিনের মধ্যে সম্মতি দেবেন; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্মতি না দিলেও বিলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গৃহীত হয়েছে বলে গণ্য হবে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, রাষ্ট্রপতির কিছু স্বাধীন ক্ষমতা বাড়ানো হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব কমতে পারে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট না হলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সাংবিধানিক দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এসব প্রস্তাব এখনো নীতিগত বা সংস্কার-পর্যায়ের আলোচনা; কার্যকর হতে হলে সংবিধান সংশোধনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর থাকলেও, ভবিষ্যতে কিছু স্বাধীন সাংবিধানিক ক্ষমতা যুক্ত হলে দেশের ক্ষমতার ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।



