একটি সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি হলো তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসে। প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য বিভিন্ন সংস্থার হাতে থাকলেও সেগুলো যথাসময়ে একত্র করে হামলার ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
নাইন-ইলেভেন হামলার ২৫ বছর পূর্তিতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার সদস্যরা চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে। এর মধ্যে দুটি বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে এবং একটি বিমান পেন্টাগনে আঘাত হানে। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হয়। হামলায় প্রাণ হারান ২ হাজার ৯৭৭ জন। ঘটনার মাত্র কয়েকদিন পর, ২০ সেপ্টেম্বর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেন।
এরপরের দুই দশকে আফগানিস্তান ও ইরাকসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক অভিযান বৈশ্বিক পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে বড় পরিবর্তন আনে।
তবে পরবর্তী সময়ে সামনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ৯/১১ কি আসলেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল?
বাস্তবে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বহু বছর ধরেই আল-কায়েদা ও ওসামা বিন লাদেনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত ছিল। এমনকি লাদেনকে খুঁজে বের করার জন্য সিআইএর আলাদা টাস্কফোর্সও ছিল। কিন্তু বিভিন্ন সংস্থার হাতে থাকা তথ্য এক জায়গায় এনে সম্ভাব্য হামলার চিত্র তৈরি করা সম্ভব হয়নি। সিআইএ ও এফবিআইয়ের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ঘাটতিও বড় দুর্বলতা হিসেবে উঠে আসে।
এই ব্যর্থতার পর যুক্তরাষ্ট্র তার গোয়েন্দা কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনে। ১৮টি গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে তৈরি করা হয় ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টার। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করা হয় ডাইরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স পদ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ‘ফাইভ আইজ’ জোটের মধ্যেও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়।
তবে সংস্কারের পরও গোয়েন্দা ব্যর্থতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের ক্ষেত্রে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার বিষয়ে ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করেছিল যুক্তরাজ্যের এমআই৬। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের এমআই৫-ও কয়েকটি বড় হামলার আগে ঝুঁকি শনাক্ত করতে ব্যর্থতার সমালোচনার মুখে পড়ে। ২০০৫ সালের ৭ জুলাই লন্ডনে আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং ২০১৭ সালের ম্যানচেস্টার অ্যারেনা হামলা এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
সাবেক এমআই৫ প্রধান লর্ড জোনাথন ইভান্সের মতে, একসময় আল-কায়েদার মতো জঙ্গিগোষ্ঠীই ছিল প্রধান হুমকি। কিন্তু বর্তমানে রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলোর কর্মকাণ্ডও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতও গোয়েন্দা মূল্যায়নের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি বিশ্ব জ্বালানি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলেছে। এসব ঘটনায় সামরিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি গোয়েন্দা মূল্যায়নের নির্ভুলতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৯/১১-এর পর শুধু সামরিক অভিযানই বাড়েনি, নিরাপত্তার নামে মানবাধিকার নিয়েও তৈরি হয় ব্যাপক বিতর্ক। গুয়ানতানামো বে-তে সন্দেহভাজনদের দীর্ঘমেয়াদি আটক, বিভিন্ন দেশে গোপন অভিযান এবং বেআইনি আটক নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো সমালোচনার মুখে পড়ে। যুক্তরাজ্যও অতীতে লিবিয়ার এক নাগরিককে অপহরণ করে গাদ্দাফি সরকারের কাছে হস্তান্তরের ঘটনায় ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়।
এদিকে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দীর্ঘ মনোযোগের সুযোগে রাশিয়া ও চীন সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে নেয়। সাবেক এমআই৬ প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়ঙ্গারও স্বীকার করেছেন, সন্ত্রাসবাদের দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে গিয়ে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চীনের দ্রুত উত্থানের মতো দীর্ঘমেয়াদি হুমকিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে পারেনি।
আজকের বিশ্ব আরও প্রযুক্তিনির্ভর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিং গোয়েন্দা কার্যক্রমে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও ভুল তথ্য বিশ্লেষণ বা ভুল মূল্যায়নের ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা দেখিয়েছে, বিপুল গোয়েন্দা সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বড় ধরনের কৌশলগত বিস্ময় এখনও সম্ভব।
নাইন-ইলেভেনের ২৫ বছর পর তাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো শুধু তথ্য সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়। সেই তথ্য সময়মতো ভাগাভাগি করা, সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াই একটি কার্যকর গোয়েন্দা ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।



