ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন বিমান ও ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জামের মধ্যে অন্তত ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন রয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বহু সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পেন্টাগনের একটি পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রতিবেদনের বরাতে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
মার্কিন প্রতিরক্ষা ইন্সপেক্টর জেনারেলের প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির প্রথম সরকারি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে মার্কিন গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গেও অসঙ্গতি তুলে ধরেছে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত ও উন্নত অস্ত্র রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে যুদ্ধের সময় গোলাবারুদের ঘাটতি ও সরবরাহ সংকটের তথ্য উঠে এসেছে।
নিহত ও আহত মার্কিন সেনা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধে অন্তত ১১ জন মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের বাইরে আরও সাতজন মারা গেছেন। এছাড়া ৩০ জুন পর্যন্ত ইরানের হামলায় অন্তত ৪১৭ জন মার্কিন সামরিক সদস্য আহত হয়েছেন।
ইরানের হামলায় কুয়েত, সৌদি আরব, জর্ডান ও ইরাকে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ১২ মার্চ ইরাকে একটি কেসি-১৩৫ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন নিহত হন। ১ জুলাই আরব সাগরে একটি এমএইচ-৬০এস হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হলে আরও একজন নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্রের কত বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে
মার্কিন ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় যুদ্ধবিমান, আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল বিমান, হেলিকপ্টার এবং চালকবিহীন নজরদারি বিমান রয়েছে।
এফ-১৫ই: অন্তত চারটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি কুয়েতের আকাশে নিজেদের বাহিনীর ভুল হামলায় ভূপাতিত হয় এবং আরেকটি ইরানের আকাশে যুদ্ধে ধ্বংস হয়।
এফ-৩৫এ: যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত একটি অত্যাধুনিক এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমান ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ-১০: অন্তত একটি এ-১০ আক্রমণাত্মক বিমান ইরানের হামলায় ভূপাতিত হয়েছে।
কেসি-১৩৫: অন্তত সাতটি কেসি-১৩৫ আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর একটি ইরাকে বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জনের প্রাণহানি ঘটে।
ই-৩ সেন্ট্রি: সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে মাটিতে থাকা অন্তত একটি ই-৩ সেন্ট্রি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এইচএইচ-৬০ডব্লিউ: যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের সময় অন্তত একটি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এমকিউ-৪সি ট্রাইটন: প্রায় ২৪ কোটি ডলার মূল্যের অন্তত একটি উচ্চ উচ্চতায় দীর্ঘসময় উড়তে সক্ষম নজরদারি ড্রোন বিধ্বস্ত হয়েছে।
এএইচ-৬: উদ্ধার করা সম্ভব নয় বিবেচনায় চারটি ছোট হেলিকপ্টার ধ্বংস করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি: অন্তত একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ৮ জুন হরমুজ প্রণালির কাছে ভূপাতিত হয়।
এমএইচ-৬০এস: একটি বহুমুখী হেলিকপ্টার ১ জুলাই আরব সাগরে বিধ্বস্ত হয়। চার ক্রুর মধ্যে তিনজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হলেও একজন নিখোঁজ হন।
এমকিউ-৯ রিপার: যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন হারিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষতি
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের আগে ও চলাকালে পর্যাপ্ত নৌঘাঁটি ও সহায়তা বন্দর স্থাপন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। সামরিক সরবরাহ পুনরায় পূরণে স্বাগতিক দেশের অনুমতির জটিলতা এবং দীর্ঘ পরিবহন সময় এ সংকট আরও বাড়িয়েছে।
মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাতেও ক্ষয়ক্ষতি
পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোও ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক ব্যয় ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
ইরাকে জুনের শেষ পর্যন্ত মার্কিন মিশনের ওপর ৬০০টির বেশি হামলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রায় ১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হয়েছে।
কুয়েত সিটিতে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির কারণে মার্কিন দূতাবাসের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। সৌদি আরবে রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে ইরানি ড্রোন হামলায়ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেলের একটি ইউটিলিটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।



