নেপালের নুওয়াকোট জেলার দেবীঘাট এখন যেন এক বিধ্বস্ত জনপদ। চীন সীমান্তবর্তী ত্রিশূলী ও তাদি নদীর মিলনস্থলে গড়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক কেন্দ্রের বাড়িঘর ও স্থাপনাগুলো কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েছে। কোথাও ভবনের চতুর্থ তলা পর্যন্ত কাদার দাগ, কোথাও ভেঙে পড়েছে দেয়াল ও স্থাপনার ভিত্তি।
গত ২৬ আগস্ট বুধবার সকালে ভয়াবহ বন্যায় দেবীঘাটের প্রায় ৬০০টি বাড়ি ও স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা দেবিকা পোডেল। তিনি জানান, নদীর পানি প্রবেশের সময় মাটি ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠছিল। বন্যার পানির সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ ভেসে আসায় মানুষের মরদেহও মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সমন্বয় কেন্দ্রের ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল দেবীঘাট ও আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করেছে। প্রতিনিধিদলে বাংলাদেশ, ভারত, জাপান ও ভুটানের সরকারি কর্মকর্তা, ত্রাণকর্মী এবং সাংবাদিকরা ছিলেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী গোবিন্দ প্রসাদ ধাহাল বলেন, একসময় দেবীঘাটে কয়েক হাজার মানুষের বসবাস ছিল এবং এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যকেন্দ্র। তার চাল ও অন্যান্য শস্যের বড় ব্যবসা ছিল। তবে ভয়াবহ বন্যায় তার দোকানও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সমন্বয় কেন্দ্রের কর্মকর্তা সুদান বিকাশ মহার্জন জানান, দেবীঘাট থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার উজানে দুর্যোগটির সূত্রপাত। সাধারণ সময়ে ত্রিশূলী নদীতে প্রতি সেকেন্ডে ২০০ থেকে ৫০০ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়। কিন্তু বন্যার দিন পানির প্রবাহ বেড়ে প্রায় ১৭ হাজার ঘনমিটারে পৌঁছায়। পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পলি ও পাথরও নেমে আসে।
নুওয়াকোটের ত্রিশূলী বাজারেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। সেখানে দুটি সেতু পুরোপুরি ভেসে গেছে। নুওয়াকোট থেকে চীনের সীমান্তমুখী ৪২ কিলোমিটার সড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ১২ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় ১ হাজার ৩৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫ হাজার ১৩০ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়া ৪ হাজার ৮০০ বাণিজ্যিক স্থাপনা, ১৩টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, ৬৮টি ঝুলন্ত সেতু, ৩৭টি সড়কসেতু ও ৬৯ কিলোমিটার সড়ক ধ্বংস হয়েছে।
প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রয়োজন নিরূপণ অনুযায়ী, বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে নেপালের প্রায় ৪৭৭ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। ফলে দেবীঘাটের মতো বিধ্বস্ত জনপদগুলোর সামনে ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি জীবনযাত্রা ও স্থানীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।



