পরীক্ষামূলক সংস্করণ

অপ্রতিম হত্যার পর সামনে কুমিল্লার কিশোর গ্যাংয়ের দীর্ঘ ইতিহাস

কুমিল্লা শহরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ, মাদক কারবার ও হত্যাকাণ্ডে এসব দলের সদস্যদের নাম আসায় নগরজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লার কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তৃত তৎপরতা আবারও সামনে এসেছে।

গত মে মাসের এক শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লার কাপ্তানবাজার এলাকায় এমনই এক অস্ত্রের মহড়া দেখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এক ব্যবসায়ীর ভাষ্য, ‘একদল কিশোর রামদা নিয়া চিৎকার করতে করতে সড়কে মহড়া দিচ্ছিল। ভয়ে ব্যবসায়ীরা শাটার নামিয়ে দোকানের ভেতরে ঢুকে পড়েন। কুমিল্লার কাপ্তানবাজারের মানুষ প্রকাশ্যে এমন অস্ত্রের মিছিল আগে দেখেনি। ঘটনার আকস্মিকতায় পথচারীরাও ভয়ে ছোটাছুটি করছিলেন।’

ঘটনাটি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেদিন গোমতী নদীর তীরের ভাটারপুকুর থেকে কাপ্তানবাজার, বৌবাজার, চানপুর ও সংরাইশ পর্যন্ত এলাকায় ১০০ থেকে ১৫০ জন কিশোর ও তরুণ ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে রামদা, চাপাতি ও লাঠি নিয়ে মহড়া দেয়। তাদের সামনে ছিল উচ্চ শব্দে চলা কয়েকটি মোটরসাইকেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েই তারা এই মহড়ায় নেমেছিল।

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, ওই কিশোর দলটির নাম ‘ক্রাইম সেটআপ’। সেদিনই নতুন দলটির আত্মপ্রকাশের তথ্য পুলিশের নজরে আসে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমিল্লা শহরে বর্তমানে অন্তত ২০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। চলতি বছরের সাড়ে আট মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম এসেছে। সর্বশেষ ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি জঙ্গলে নিয়ে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়া ও হত্যার ঘটনায় দুই কিশোরসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত হিসেবে পুলিশের দাবি করা ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনও একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। অপ্রতিমকেও সেই দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। টিকটকের জন্য ভিডিও তৈরির আড়ালে অন্য কিশোরদের একত্র করার চেষ্টা চলছিল বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পারিবারিক সূত্রের ভাষ্য, অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার অন্য কিশোরদের একজন সৌদিপ্রবাসী বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আইফোন কিনেছিল। সেটি দিয়ে ভিডিও তৈরি করে নিয়মিত টিকটকে পোস্ট করা হতো। আরেক কিশোর কিনেছিল মোটরসাইকেল।

অভিযুক্তদের একাধিক ‘গ্যাং পার্টিতেও’ অংশ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, তুহিন গত কয়েক মাসে কয়েকটি পার্টির আয়োজন করেছিলেন। এসব আয়োজনে কিশোর দলকে নিয়ে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও কর্মসূচিতেও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন।

অপ্রতিমের মা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। সেই ঘটনার জেরে তাঁর একমাত্র সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে। তবে পুলিশ প্রাথমিকভাবে অপ্রতিমকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার পেছনে অন্য কারণের সম্ভাবনাও তদন্তের দাবি করা হয়েছে।

কাপ্তানবাজারের মতো একই ধরনের আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন সংরাইশ ও চানপুর এলাকার বাসিন্দারাও। চানপুরের এক অভিভাবকের ভাষ্য, কিশোর গ্যাংয়ের অনেক সদস্যই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। এ কারণে সন্তানদের বাইরে পাঠাতেও তাঁরা ভয় পাচ্ছেন।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতেও কুমিল্লার রানীর দিঘির পাড়ে অস্ত্রের মহড়া দেখা যায়। সে সময় স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেছিলেন, ‘ভয়ে আমার প্রাণটা যেন যায় যায় অবস্থায় ছিল।’ তাঁর অভিযোগ ছিল, কিশোরদের দলগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

এর কয়েক মাস পর ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে রানীর দিঘির পাড়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একদল কিশোরের মহড়ার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব কোণ থেকে হঠাৎ একদল কিশোর অস্ত্র নিয়ে মহড়া শুরু করে এবং বাজি ফুটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। একই বিকেলে তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়াতেও অস্ত্রধারী দলগুলোর উপস্থিতির কথা জানা যায়।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২৫০ জনের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে বয়স কম হওয়ায় গ্রেপ্তারের পর অনেকেই দ্রুত মুক্তি পেয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অনেকের মা-বাবাকে ডেকে মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, বয়স কম হওয়ায় শুধু পুলিশের তৎপরতা দিয়ে কিশোরদের অপরাধ বন্ধ করা কঠিন।

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ের বিষয় নয়। ২০১৫ সালের দিকে বিষয়টি নগরে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তখন তিন থেকে চারটি দল বেশি সক্রিয় ছিল। ২০২২ সালের দিকে সেই সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২০টিতে দাঁড়ায়। শাখা ও উপদল মিলিয়ে সংখ্যা আরও বেশি ছিল।

সে সময় রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, ইগল, আরজিএস, র‍্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিএমসি, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ ও বসসহ বেশ কয়েকটি দলের নাম আলোচনায় আসে। ধর্মসাগরপাড়সহ বিভিন্ন এলাকার দেয়ালে এসব গ্যাংয়ের নাম ও লোগোও দেখা যেত। সদস্যদের মেসেঞ্জার গ্রুপ, নির্দিষ্ট পোশাক ও চুলের ছাঁট এবং নির্ধারিত আড্ডাস্থল ছিল।

২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম এসেছে। এর বাইরে শতাধিক অপরাধের ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এলাকায় দখল ও পাল্টাপাল্টি শক্তি প্রদর্শনেও বিভিন্ন সময়ে তাদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।

কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা (টিপু) বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্য জায়গায় কী অবস্থা জানি না। তবে কুমিল্লায় বর্তমানে এমন কোনো পাড়ামহল্লা নেই, যেখানে কিশোর গ্যাং নেই। তাদের এখনই থামাতে হবে, কোনোভাবেই বাড়তে দেওয়া যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, বিগত সময়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে। বিএনপির কেউ কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, এমন তথ্য তাঁর জানা নেই।

পুরোনো দ্বন্দ্বের অন্যতম উদাহরণ রতন ও ইগল গ্রুপের বিরোধ। ২০২২ সালে ধর্মসাগর পাড় ও নগর উদ্যান এলাকা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের মধ্যে ১৫ বছরের রবিউল হাসান শাহাদাতকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সার্কিট হাউস মোড় এলাকায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুজন আহত হন। ককটেল বিস্ফোরণের ওই ঘটনায় ১৬ জনকে গ্রেপ্তার এবং চারটি মামলা করা হয়।

২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট হাউজিং এলাকার কেটিসিসি মাঠে কিং স্কোয়াড নামের একটি কিশোর দলের ২১ সদস্যকে আটক করে পুলিশ। তাদের বয়স ছিল ১৫ থেকে ২১ বছর। পুলিশের ভাষ্য, দলটি ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরে তাদের কাছ থেকে চাপাতি, চায়নিজ কুড়াল, হকিস্টিক ও রড জব্দ করা হয়।

কুমিল্লা জেলায় কিশোর গ্যাংয়ের হালনাগাদ তালিকা পুলিশের কাছে নেই। তবে স্থানীয়ভাবে কিং স্কোয়াডসহ পাঁচটি দলকে বর্তমানে বেশি আলোচিত বলে জানা গেছে। অন্য দলগুলো হলো স্কোয়াড বা রতন গ্রুপ, ইগল, সিবিকে ও ক্রাইম সেটআপ। এর বাইরে অপু ও সাব্বিরের নামে আরও দুটি গ্রুপের কথা জানা যায়। তবে অনেক সদস্য একাধিক দলের সঙ্গে চলাফেরা করায় এগুলোকে কেউ কেউ উপদল হিসেবেও দেখেন।

পুলিশের নথিতেও একই সদস্যের একাধিক উপদলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে। ২০২৪ সালের ১১ অক্টোবর তানজিম আবদুল্লাহকে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানিয়েছিল, তিনি সিবিকে, সিবিকে ডেঞ্জার জোন, সিবিকে জুনিয়র, সিবিকে স্পেশালসহ ছয়টি উপদলের নেতৃত্ব দিতেন। এগুলোকে পৃথক গ্যাং হিসেবে ধরা হলে মোট সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ধর্মসাগরপারের রানীর কুঠি এলাকায় নাফিজ অময়কে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় রতন গ্রুপের তিনজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত প্রায় ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। স্বজনদের ভাষ্য, হামলায় নাফিজের একটি হাত প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর জখম হয়।

নাফিজের এক বন্ধু জানান, আগের দিন সাইফুলের হাতে আরেক তরুণ আহত হওয়ার প্রতিবাদ করেছিলেন নাফিজ। এর জের ধরে রতন ও সাইফুলের নেতৃত্বে ৩০ থেকে ৪০ জন তাঁকে আক্রমণ করে। ওই ঘটনার পর রতন ও তাঁর সহযোগীরা আত্মগোপনে গেলে ২৫ এপ্রিল রানীর দিঘি, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায় সিবিকে, ইগলসহ বিভিন্ন পক্ষ অস্ত্র নিয়ে শক্তি প্রদর্শন করে।

এর দুই দিন পর দুর্গাপুর ও রেসকোর্স এলাকায় সেনাবাহিনী ও র‍্যাবের যৌথ অভিযানে নয়জন এবং পুলিশের পৃথক অভিযানে আরও নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। যৌথ অভিযানে পিস্তল, রিভলভার, গুলি, দেশীয় অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের কথা জানানো হয়।

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এখন নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। তবে কান্দিরপাড়, ধর্মসাগর, রানীর দিঘি, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ার আশপাশে তাদের উপস্থিতি ও সংঘাতের ঘটনা বেশি আলোচিত। মফিজাবাদ ও রেসকোর্স এলাকায় রতন গ্রুপের প্রভাবের কথা বলা হয়। অশোকতলায় গ্যাং-সংশ্লিষ্ট মাদক কারবারের বিরোধে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। হাউজিংয়ের কেটিসিসি মাঠে কিং স্কোয়াড এবং গোমতীর তীরের ভাটারপুকুর, কাপ্তানবাজার, বৌবাজার, চানপুর ও সংরাইশে ক্রাইম সেটআপের তৎপরতার কথা জানা গেছে।

২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর রাতে অশোকতলায় সজীব হোসেন ওরফে বাবুকে পেটানো ও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরদিন হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশের ভাষ্য, ঘটনার নেপথ্যে কিশোর গ্যাংয়ের মাদক কারবার ছিল। সজীবের বড় বোন সনিয়া আক্তার হামলাকারীদের ‘ভয়ংকর কিশোর গ্যাং’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

গত ২৪ জুন কাঁটাবিল এলাকায় মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে অপু গ্রুপ ও সাব্বির গ্রুপের বিরোধ শুরু হয়। পরদিন সংঘর্ষ ও গুলির মধ্যে টিফিনের সময় বাইরে বের হওয়া ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইথান আহমেদ গুলিবিদ্ধ হয়। পরে চারজনকে গ্রেপ্তার এবং একটি বিদেশি পিস্তল ও ছয়টি গুলি উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বয়স ছিল ১৯ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। পুলিশ অবশ্য এই দুই পক্ষকে স্থানীয় গ্রুপ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

গত ২ এপ্রিল ধর্মসাগর পাড়ে নারী কনস্টেবল জাকিয়া সুলতানাকে অশালীন মন্তব্য করার প্রতিবাদ করায় তাঁর স্বামী পুলিশ কনস্টেবল কাজী আব্দুল্লাহ মো. জোবায়েরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আহত করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ ১২ ঘণ্টার মধ্যে রিফাত ও সিয়াম নামে ১৯ ও ২০ বছর বয়সী দুজনকে গ্রেপ্তার করে।

কিশোর গ্যাং বলা হলেও এসব দলের সব সদস্য অপ্রাপ্তবয়স্ক নয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে একটি গ্যাং-সংশ্লিষ্ট অভিযানে ১৯, ২০, ২১, ২৮, ২৯, ৪৫ ও ৪৭ বছর বয়সী ব্যক্তিদের নাম আসে। সেখানে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগে মো. রুবেল (৩৫) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ কারণে স্কুল-কলেজপড়ুয়া অল্প বয়সী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বয়সে বড় তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের বন্ধুত্বের বিষয়টিও সামনে এসেছে। অপ্রতিমের সঙ্গে হত্যায় অভিযুক্তদের বন্ধুত্বকেও তদন্তসংশ্লিষ্টরা ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে তার পূর্বপরিচয়ের বিষয়টিও পুলিশের তদন্তে এসেছে।

কুমিল্লার কিশোর গ্যাংগুলোর কর্মকাণ্ডে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। টিকটক ভিডিও, ফেসবুক পোস্ট কিংবা বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে কিশোর-তরুণদের একত্র করার তথ্য পাওয়া গেছে।

অনেক সদস্যের হাতে আইফোনসহ দামি মুঠোফোন রয়েছে। এসব ফোন দিয়ে ভিডিও তৈরি করে বিভিন্ন সংলাপ যুক্ত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে মোটরসাইকেলের ব্যবহারও তাদের মধ্যে ব্যাপক। উচ্চ শব্দ তৈরির জন্য অনেক মোটরসাইকেলে পরিবর্তন আনার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সদর দক্ষিণের গন্ধমতী কোটবাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেল মেরামতের ব্যবসা করা মো. নাদিম খান বলেন, আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নয় এমন অনেক তরুণকে দামি মোটরসাইকেল ও মুঠোফোন ব্যবহার করতে দেখা যায়। তাঁদের উচ্চ শব্দ করে মোটরসাইকেল চালানো ও চলাফেরার বিষয়েও তিনি উদ্বেগ জানান। তাঁর মতে, এ বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, দামি ফোন ও মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক বন্ধুত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের সঙ্গে সালমানপুরের ১৫ বছর বয়সী আরেক কিশোরের স্কুলে পড়ার সূত্রে বন্ধুত্ব হয়। পরে ওই বন্ধুর মাধ্যমে তার পরিচয় হয় তুহিনের সঙ্গে। তার বাবা সৌদিপ্রবাসী। পরিবারের একমাত্র ছেলে হিসেবে তাকে একটি আইফোন কিনে দেওয়া হয়েছিল। সে নিয়মিত টিকটক ভিডিও তৈরি করত।

পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় তিন বছর আগে হাতিগাড়ায় বাড়ি করার আগে পরিবারটি কোটবাড়ির চাঙ্গিনী এলাকায় থাকত। গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ তার কাছ থেকে ফোনটি নিয়ে যায় বলে নানি জানিয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের একটি সূত্র বলেছে, ফোনটি অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ আলামত।

অন্যদিকে, অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার ১৯ বছর বয়সী মো. সিয়াম সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সুধন্যপুর গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের ভাষ্য, বাবা প্রায় তিন বছর আগে মারা গেছেন। বড় ভাইয়ের আয় ও মায়ের জমি বিক্রির অর্থে সংসার চলে। আফজাল খান টেকনিক্যাল অ্যান্ড কমার্স কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র সিয়াম প্রায় এক বছর আগে মোটরসাইকেল কিনেছিলেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, মোটরসাইকেলকে কেন্দ্র করেই তুহিনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অপ্রতিম হত্যার রাতে তুহিন সিয়ামের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা আড্ডা দেন এবং তাঁকে হত্যার কথা জানান।

সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, এসব তরুণকে বিভিন্নভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অভিভাবকদের সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং কী করছে, সে বিষয়ে খোঁজ রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ন্ত্রণের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

প্রধান খবর

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সস্ত্রীক যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলায় ভাষণ দেবেন।

বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে প্রাতরাশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আয়োজিত স্বাগত প্রাতরাশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমান অংশ নিয়েছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী।

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বৈঠক ও কর্মসূচিতে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোহিঙ্গা, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক বিষয়ও আলোচনায় থাকবে।

আসছে...