‘ওর বান্ধবীরা খুব খারাপ। এ জন্য ছয় মাস স্কুলে পাঠাইনি। আমার সামনে থাকুক। কোনো বাচ্চাকে কি কেউ একা ছাড়ে? আমাকেও কিছু বলে যায়নি, তার বাবাকেও বলে যায়নি।’ সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনকে হারিয়ে এভাবেই আহাজারি করছিলেন তার মা কেয়া খাতুন। মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। আশঙ্কা থেকে প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি। কিন্তু এত সতর্কতার পরও মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি বলে আক্ষেপ করছেন তিনি।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে গণমাধ্যমের সামনে এসব কথা বলেন কেয়া খাতুন।
তাজমিনের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন তার মা। কোনো অঘটন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে মেয়েকে নিজের চোখের সামনে রাখার চেষ্টা করতেন তিনি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে জানতে চাইতেন। তার কাছে বান্ধবীর নাম ও বাসার ঠিকানাও জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মেয়েকে নিয়ে মায়ের সেই উদ্বেগ শেষ পর্যন্ত মর্মান্তিক পরিণতি ঠেকাতে পারেনি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার গলায় প্যাঁচানো ছিল একটি গামছা। মরদেহের কাছেই পড়ে ছিল একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন বিকেল ৪টার দিকে মেয়ের সঙ্গে শেষবার কথা হয় কেয়া খাতুনের। তখনো মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। তাজমিনের কাছে তার বান্ধবীর নাম ও বাসার ঠিকানা জানতে চেয়েছিলেন। মেয়েকে বলেছিলেন, ‘তোর বান্ধবীর নাম বল, বাসার ঠিকানা বল, বাসায় গিয়ে নিয়ে আসব।’
কিন্তু মায়ের সঙ্গে সেই কথোপকথনের পর আর মেয়েকে ফিরে পাওয়া হয়নি। যে মেয়েকে সব সময় আগলে রাখতে চেয়েছিলেন, তারই মরদেহ উদ্ধার করা হয় ধানক্ষেত থেকে। মেয়েকে হারিয়ে এখন বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন কেয়া খাতুন।
এ ঘটনায় তাজমিনকে বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমনকে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রামে তার ভাইয়ের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন অগ্রগতি এসেছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, সুমন একাই এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, তাজমিনের মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক সংস্থা তদন্ত শুরু করেছে।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ্ বলেন, শুক্রবার সকালে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় সিএনজিচালিত অটোরিকশাটিও জব্দ করা হয়েছে। নিহতের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তার গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ ও হত্যার ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির নিবন্ধন রয়েছে। সেটির সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, ঘটনার শুরু থেকে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।



