কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের তদন্তে তার কক্সবাজার যাত্রা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় এবং নিখোঁজ হওয়ার আগের কয়েক দিনের নানা তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে ওই শিক্ষার্থী সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়ার (৩৫) ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। এ ঘটনায় তদন্তকারীরা তার যাতায়াত, পরিচিতজন এবং ঘটনার আগের যোগাযোগের তথ্য খতিয়ে দেখছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে রাজু চৌধুরী (২০) নামে এক যুবকের পরিচয় হয় এবং পরে তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরিচয়ের প্রায় ১৭ দিনের মাথায় রাজুর সঙ্গে কক্সবাজারে যায় সে। রাজু কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করেন। তবে ওই শিক্ষার্থী ঠিক কবে কক্সবাজারে গিয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে সে পার্শ্ববর্তী জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। পরে কুমিল্লায় ফিরে সেখান থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মাকে জানিয়েছিল, এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছে।
কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানের কাছে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে ওই শিক্ষার্থীর নামার দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কক্সবাজারের কক্সেস প্যানারেমিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির কর্মী আবদুল্লাহ জানান, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত আটটার পর ওই শিক্ষার্থী ও রাজু তাঁদের কাউন্টারে বাসের টিকিট কাটতে যান। তাঁর মনে ছিল, একজন ছেলে ও একজন মেয়ে টিকিট নিতে এসেছিলেন। সে সময় তাঁদের সাধারণ যাত্রী হিসেবেই দেখেছিলেন তিনি।
আবদুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, যুবকটি পরদিন বুধবারের জন্য একটি টিকিট কাটেন। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসটি কুমিল্লার উদ্দেশে কক্সবাজার ছাড়ে। রাতে বাসটি কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানের কাছে পৌঁছায়।
ওই শিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাসে যাতায়াত করা মেয়েটির পরিচয় সম্পর্কে খোঁজ নিতে শুরু করেন আবদুল্লাহ। পরে তিনি বুঝতে পারেন, বাসে দেখা মেয়েটি ওই নিহত শিক্ষার্থী। পুলিশ তাঁর কাছে তথ্য চাইতে পারে—এমন ধারণা থেকে ঘটনার বিষয়ে তথ্যও প্রস্তুত করেন তিনি। পরে জানতে পারেন, তদন্তে ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে কক্সবাজার যাওয়া যুবককে হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে শনাক্ত করা হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে অটোরিকশাচালক সুমন মিয়ার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
নিহত শিক্ষার্থীর মা জানান, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। তখন মেয়ে জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে নিয়ে আসতে বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। এ জন্য মেয়ের কাছে বান্ধবীর নাম এবং তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চান। কিন্তু মেয়ে এ বিষয়ে কিছু জানায়নি।
মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে তিনি আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজ রাখার চেষ্টা করতেন তিনি। তবে এসব সতর্কতার পরও মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি বলে আক্ষেপ করেন তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মায়ের সন্দেহের তালিকায় থাকা এক বান্ধবী ওই শিক্ষার্থীর চেয়ে বয়সে বড়। তবে হত্যাকাণ্ডে ওই বান্ধবী বা তাঁর সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি বলে তাঁরা জানিয়েছেন। তদন্তে শিক্ষার্থীর আচরণ ও মোবাইল গেম খেলার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
ওই শিক্ষার্থীর শিক্ষক জানান, সে চঞ্চল স্বভাবের ছিল। মা অসুস্থ থাকলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখাশোনা করত সে। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন এবং সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। শিক্ষার্থীকে তিনি খুব আদর করতেন বলে শিক্ষক জানান। ঘরে রাগ হলে সে হুট করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান এ ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, রাজুর সঙ্গে ওই শিক্ষার্থীর সম্পর্ক না হলে হয়তো তাকে কক্সবাজার যেতে হতো না এবং এমন বিপদের মুখেও পড়তে হতো না। এটি তাঁর ব্যক্তিগত মূল্যায়ন; হত্যাকাণ্ডের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তদন্তের তথ্য ও প্রমাণই গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা বাস থেকে পদুয়ারবাজারের হোটেল নূরজাহানের কাছে নেমে ওই শিক্ষার্থী শহরের রেইসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে। অটোরিকশাটির চালক ছিলেন সুমন মিয়া।
পুলিশ জানিয়েছে, সুমন ওই শিক্ষার্থীকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করে। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাটির তদন্তে শিক্ষার্থীর যাতায়াত, যোগাযোগ এবং হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



