২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি আলোচিত মামলায় ২৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুটি বেঞ্চ। এসব মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড পেয়েছেন আরও ৩৩ জন। একজন আসামি খালাস পেয়েছেন।
সম্প্রতি প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয়েছে ৭০টি। এর মধ্যে ২৬টি মামলা বিচারাধীন এবং ৪৪টি মিস কেস হিসেবে রয়েছে। দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসব মামলায় এখন পর্যন্ত সাতটির রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এসব মামলায় মোট দণ্ডিত আসামির সংখ্যা ৬৮ জন।
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত দুটি ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০৩ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন। অন্যদিকে পলাতক আসামির সংখ্যা ৩৫২ জন।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে দুটি ট্রাইব্যুনাল সাতটি আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেছেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে অবশিষ্ট মামলাগুলোর বিচার দ্রুত শেষ হবে এবং রায় কার্যকর করা সম্ভব হবে। পলাতক আসামিদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রচেষ্টাও চলছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন এবং কোনো দোষী ব্যক্তি যেন বিচারের বাইরে না থাকেন, তা নিশ্চিত করার কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর।
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি শহীদদের পরিবার এবং আহত ব্যক্তিদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেন ট্রাইব্যুনাল।
চাঁনখারপুলে ছয় হত্যার মামলায় তিন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চাঁনখারপুলে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিতে ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ঘোষিত এ রায়ে আরও পাঁচ পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর দুই আসামি হলেন সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম। এ মামলায় অন্য আসামিদের মধ্যে কয়েকজনকে তিন থেকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড
আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানো এবং আরও একজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত রায়ে আরও সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনি, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, সাবেক এসআই আবদুল মালেক, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার এবং স্থানীয় যুবলীগ নেতা রনি ভূঁইয়া। এ মামলায় আরও দুই আসামিকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রাজসাক্ষী হওয়া শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করেন ট্রাইব্যুনাল।
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুইজনের মৃত্যুদণ্ড
২০২৪ সালের জুলাইয়ে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন সাবেক এএসআই মো. আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।
একই রায়ে তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া অন্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, শিক্ষক, পুলিশ কর্মকর্তা এবং তৎকালীন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীও দণ্ডিত হন।
রামপুরায় তরুণকে গুলির মামলায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি এবং একই এলাকায় আরও দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
গত ২৮ জুন ঘোষিত রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান। একই মামলায় সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন এবং সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড
জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গত ৩০ জুন ঘোষিত রায়ে তাঁকে দুটি অভিযোগে এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়।
মামলায় গণঅভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের মাধ্যমে কমান্ড রেসপনসিবিলিটি এবং কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ১৫ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা সবাই পলাতক। রায়ে ওবায়দুল কাদেরসহ পাঁচ আসামির সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার আদেশও দেন ট্রাইব্যুনাল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে গুম-খুনের অভিযোগের বিচারও দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে।



