অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক
রাজধানীর ঢাকার মোহাম্মদপুর এখন যেন এক অঘোষিত অপরাধ নগরী। দিন-রাত নির্বিশেষে সন্ত্রাস, ছিনতাই, মাদক কারবার ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বাসিন্দারা—অনেকে বলছেন, “এলাকায় থাকা মানেই আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকা।”
সম্প্রতি রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে কিশোর গ্যাং নেতা ইমন ওরফে ‘এলেক্স ইমন’ নিহত হওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এনেছে এই এলাকার ভয়াবহ বাস্তবতা। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এলেক্স ইমন গ্রুপ এবং আরমান-শাহরুখ গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল। রবিবারের সেই সংঘর্ষে ৮-১০ জন মিলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ইমনকে। ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরে বর্তমানে অন্তত ১৮ থেকে ২০টি সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—কবজি কাটা আনোয়ার গ্রুপ (নেতা: আনোয়ার ওরফে শ্যুটার আনোয়ার), কিলার আকরাম গ্রুপ (আকরাম), টুণ্ডা বাবু গ্রুপ (মো. বাবু খান), বোমা আরমান গ্রুপ, গিটঠা মিঠু গ্রুপ, কসাই সোহেল গ্রুপসহ আরও বেশ কয়েকটি চক্র। এসব গ্রুপের হয়ে কাজ করে অসংখ্য কিশোর গ্যাং সদস্য, যারা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এমনকি হত্যাকাণ্ডেও জড়িত।
এছাড়া এলাকায় সক্রিয় রয়েছে নবী হোসেন গ্রুপ, এক্সেল বাবু গ্রুপ, পাপ্পু ওরফে কিলার পাপ্পু গ্রুপ, কিলার বাদল গ্রুপ, কিলার লাল্লু গ্রুপ, জনি-রনি কিশোর গ্যাং এবং গাংচিল বাহিনী। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা প্রকাশ্যেই অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করে এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।
মোহাম্মদপুর থানার বিভিন্ন ওয়ার্ডে আলাদা আলাদা সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে তেরেনাম বাবু নামে পরিচিত লিটন মাহমুদ বাবুর প্রভাব রয়েছে। ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে কিলার বাদল ও তার সহযোগীরা। ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে ক্যাপ্টেন ইমন, কিলার পাপ্পু, কাইল্লা বাদলসহ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর দাপট রয়েছে। অন্যদিকে আদাবর এলাকাজুড়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছে মনোয়ার হোসেন জীবন ওরফে লেদু হাসান গ্রুপ।
মাদক কারবারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়ংকর হিসেবে চিহ্নিত জেনেভা ক্যাম্প। এখানে প্রকাশ্যেই দিন-রাত ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজার বেচাকেনা চলে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের আগেই খবর পেয়ে যায় কারবারিরা। বর্তমানে ক্যাম্পে মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পার মনু, পিচ্চি রাজা ও চুয়া সেলিম গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।
এলাকার অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ হলো ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনার পর মোহাম্মদপুর থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র। সরকারি ৫৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, হাজার হাজার গুলি এবং বেসরকারি লাইসেন্সকৃত শতাধিক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ সন্ত্রাসীদের হাতে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ জানায়, অপরাধের বহুমাত্রিকতা ও ব্যাপকতার তুলনায় জনবল ও সরঞ্জাম অনেক কম। মাসে গড়ে প্রায় ১০০টি মামলা হয় এই থানায়। অনেক ছিনতাইয়ের ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলা না করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন, ফলে অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়।
ভৌগোলিক অবস্থানও অপরাধীদের জন্য সহায়ক। মোহাম্মদপুরের পশ্চিম পাশে নদী ও চর থাকায় অপরাধ করে দ্রুত পালিয়ে যাওয়া সহজ। উত্তরে আদাবর, পূর্বে জেনেভা ক্যাম্প এবং দক্ষিণে হাজারীবাগ এলাকার বস্তিগুলোও অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মোহাম্মদপুরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু অভিযান নয়, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগ জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একটাই দাবি—“স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চাই, নিরাপদ একটি এলাকা চাই।”



