জন্মদিনে স্মরণ লিভিং ঈগল সাইফুল আজমকে, টপ গান খেতাবধারী সেই বাঙালি আকাশযোদ্ধার গল্প
বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজমের নাম অনন্য। যুদ্ধবিমান চালনার দক্ষতা, একাধিক দেশের বিমানবাহিনীতে দায়িত্ব পালন এবং আন্তর্জাতিক সম্মাননা তাঁকে বিশ্বের পরিচিত যুদ্ধবিমান চালকদের একজন করে তুলেছে। ১৯৪১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই বাঙালি আকাশযোদ্ধার জন্মদিন আজ।
সাইফুল আজমের সামরিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো—তিনি বাংলাদেশ, পাকিস্তান, জর্ডান ও ইরাকের বিমানবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চার দেশের বিমানবাহিনীতে দায়িত্ব পালনকারী একমাত্র সামরিক পাইলট ছিলেন তিনি।
জন্ম ও শৈশব
১৯৪১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব বাংলার পাবনা জেলায় সাইফুল আজমের জন্ম। তাঁর শৈশবের একটি সময় কলকাতায় কাটে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তাঁর পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে।
১৯৫৫ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে যান। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬০ সালে প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে পাইলট অফিসার হিসেবে কমিশন লাভ করেন।
প্রশিক্ষণজীবনে তিনি সেসনা টি-৩৭ প্রশিক্ষণবিমান চালান। পরে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার লুক বিমানঘাঁটিতে উত্তর আমেরিকান এফ-৮৬ স্যাবর যুদ্ধবিমানের ওপর উন্নত প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসে স্যাবর যুদ্ধবিমান চালান।
টপ গান স্বীকৃতি
যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিমান চালনার প্রশিক্ষণকালে সাইফুল আজম তাঁর অসাধারণ দক্ষতার জন্য ‘টপ গান’ খেতাব অর্জন করেন। বাংলাদেশ আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর জানায়, প্রশিক্ষণে কৃতিত্বের জন্য তাঁকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে ‘টপ গান ট্রফি’কে প্রশিক্ষণরত কর্মকর্তাদের মধ্যে উড্ডয়ন দক্ষতার সেরার স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি তাঁর প্রশিক্ষণজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় সাইফুল আজম পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ১৭ নম্বর স্কোয়াড্রনে এফ-৮৬ স্যাবর যুদ্ধবিমান চালাতেন। তিনি সারগোধা বিমানঘাঁটি থেকে সামরিক অভিযানে অংশ নেন।
একটি স্থল আক্রমণ অভিযান শেষে তাঁর দল ভারতীয় যুদ্ধবিমানের আক্রমণের মুখে পড়ে। পাল্টা আকাশযুদ্ধে সাইফুল আজম একটি ফোল্যান্ড গনেট যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেন। এটি ছিল তাঁর প্রথম নিশ্চিত আকাশযুদ্ধের বিজয়।
এই কৃতিত্বের জন্য তিনি পাকিস্তানের ‘সিতারা-ই-জুরাত’ সম্মাননা লাভ করেন। এটি পাকিস্তানের অন্যতম সামরিক বীরত্ব পদক এবং আকাশযুদ্ধে তাঁর অসাধারণ দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়।
জর্ডান ও ইরাকে সামরিক দায়িত্ব
১৯৬৬ সালের শেষ দিকে সাইফুল আজম জর্ডানের রয়্যাল জর্ডানিয়ান বিমানবাহিনীতে সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি হকার হান্টার যুদ্ধবিমান চালাতেন এবং জর্ডানের ১ নম্বর স্কোয়াড্রনে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধের সময় তিনি জর্ডানের বিমানঘাঁটি রক্ষার অভিযানে অংশ নেন। ৫ জুন ১৯৬৭ ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর আক্রমণের সময় তিনি একটি ইসরায়েলি মিস্টেয়ার যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেন এবং আরেকটি বিমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেন বলে গ্যাদারিং অব ঈগলস ফাউন্ডেশনের তথ্য থেকে জানা যায়।
দুই দিন পর, ৭ জুন ১৯৬৭, ইরাকের এইচ-৩ বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি আক্রমণের সময় সাইফুল আজম ইরাকি হকার হান্টার যুদ্ধবিমান নিয়ে আকাশযুদ্ধে অংশ নেন। ওই অভিযানে তিনি আরও দুটি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেন বলে একই সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
জর্ডান ও ইরাকে যুদ্ধকৃতিত্বের জন্য তিনি ‘উইসাম আল-ইস্তিকলাল’ এবং ‘নওত আল-শুজা’ সামরিক সম্মাননা লাভ করেন। তিন দেশের কাছ থেকে বীরত্বের সামরিক সম্মাননা পাওয়া তাঁর সামরিক জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন।
ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার রেকর্ড
সাইফুল আজমকে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে আকাশযুদ্ধে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জনকারী পাইলট হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ক্ষেত্রে অন্য যেকোনো পাইলটের চেয়ে বেশি কৃতিত্ব অর্জন করেন।
তবে বিভিন্ন সূত্রে ভূপাতিত করা বিমানের সংখ্যা নিয়ে পার্থক্য রয়েছে। গ্যাদারিং অব ঈগলস ফাউন্ডেশন ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে তিনটি ইসরায়েলি বিমান ভূপাতিত করার তথ্য দিয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে চারটি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার কথা বলা হয়েছে।
এই কারণে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখের ক্ষেত্রে সূত্রভেদে পার্থক্যটি বিবেচনায় রাখা জরুরি। তবে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধকৃতিত্ব আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত এবং তাঁর সামরিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সাইফুল আজম পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে যোগ দেন বলে সরকারি তথ্য উল্লেখ করেছে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে ছিল ফ্লাইট সেফটি পরিচালক, অপারেশনস পরিচালক এবং বিমানবাহিনীর বিভিন্ন প্রশাসনিক ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত দায়িত্ব।
তিনি ঢাকার তেজগাঁও বিমানঘাঁটির এয়ার অফিসার কমান্ডিং হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরে বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরে প্রশিক্ষণ পরিচালক এবং প্রশাসনিক শাখার সহকারী চিফ অব এয়ার স্টাফের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৭ সালে তিনি উইং কমান্ডার পদে উন্নীত হন এবং ঢাকার বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ঘাঁটির বেস কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি গ্রুপ ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হয়ে অবসর নেন।
বাংলাদেশ আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাইফুল আজম ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
বেসামরিক বিমান চলাচলে দায়িত্ব
সামরিক জীবন শেষে সাইফুল আজম বেসামরিক বিমান চলাচল খাতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল এবং পরে ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন বলে গ্যাদারিং অব ঈগলস ফাউন্ডেশনের তথ্য থেকে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে তিনি ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন।
রাজনীতিতে অংশগ্রহণ
সাইফুল আজম সামরিক ও বেসামরিক দায়িত্বের পাশাপাশি রাজনীতিতেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে পাবনা-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনও ছিল কর্মময় এবং বহুমুখী।
লিভিং ঈগল সম্মাননা
সাইফুল আজমের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ‘লিভিং ঈগল’ সম্মাননা। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে এই সম্মাননা প্রদান করে।
বাংলাদেশ আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর জানায়, তিনি বিশ্বের মাত্র ২২ জন ‘লিভিং ঈগল’ সম্মাননাপ্রাপ্ত পাইলটের একজন ছিলেন। এই স্বীকৃতি তাঁর সামরিক বিমান চালনার অসাধারণ কৃতিত্বের আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রকাশ করে।
‘লিভিং ঈগল’ সম্মাননা তাঁর জীবনের অন্যতম বড় অর্জন। সামরিক বিমান চালনায় অসাধারণ দক্ষতা ও যুদ্ধকৃতিত্বের জন্য নির্বাচিত পাইলটদের এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সাইফুল আজমের নাম এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্যও গৌরবের বিষয়।
মৃত্যু
২০২০ সালের ১৪ জুন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাইফুল আজম মারা যান। বাংলাদেশ আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তিনি ওই দিন দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে মারা যান।
পরদিন ১৫ জুন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ঘাঁটি বাশারের প্যারেড গ্রাউন্ডে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার সময় বাংলাদেশ বিমানবাহিনী তাঁর সম্মানে বিশেষ উড্ডয়ন প্রদর্শন করে।
জানাজায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর তৎকালীন প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাতসহ সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেন।
জানাজা শেষে তাঁকে ঢাকার শাহীন কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এবং সামরিক মহলে শোক প্রকাশ করা হয়।
উত্তরাধিকার
সাইফুল আজমের জীবন ছিল সামরিক দক্ষতা, সাহস ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনের এক অনন্য উদাহরণ। চার দেশের বিমানবাহিনীতে দায়িত্ব পালন, যুদ্ধকৃতিত্ব এবং তিন দেশের সামরিক সম্মাননা তাঁকে বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে বিশেষ অবস্থান দিয়েছে।
বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর কর্মজীবন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক আকাশযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর জন্মদিনে সেই কৃতিত্ব স্মরণ করা দেশের সামরিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে স্মরণ করারই অংশ।



