ঢাকার আকাশে সন্ধ্যার পর দেখা গেল এক মনোমুগ্ধকর মহাজাগতিক দৃশ্য। চাঁদের আড়ালে কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে গেল শুক্র গ্রহ, এরপর আবার চাঁদের অপর পাশ দিয়ে উদয় হতে দেখা গেল তাকে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় ‘অকাল্টেশন’—যেখানে পৃথিবী থেকে দেখলে একটি মহাজাগতিক বস্তু সাময়িকভাবে অন্য একটি বস্তুর আড়ালে চলে যায়।
সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ২৩ মিনিটের দিকে চাঁদের পেছনে শুক্র গ্রহটি অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রায় ৩২ মিনিট পর, সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে চাঁদের অপর পাশ দিয়ে আবার শুক্র গ্রহকে দৃশ্যমান হতে দেখা যায়।
ঘটনাটি খুব অল্প সময়ের হলেও আকাশপ্রেমী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য এটি ছিল বিশেষ আকর্ষণের। কারণ, একই আকাশে চাঁদ ও শুক্র গ্রহকে পাশাপাশি দেখা যাওয়ার সুযোগ যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনি তাদের একটির আড়ালে অন্যটির অদৃশ্য হয়ে যাওয়া ঘটনাটিকে আরও ব্যতিক্রমী করে তোলে।
অকাল্টেশন কী?
‘অকাল্টেশন’ শব্দটির অর্থ হলো আড়াল করা বা ঢেকে ফেলা। পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষণ করলে যখন অপেক্ষাকৃত কাছের কোনো মহাজাগতিক বস্তু দূরের কোনো বস্তুকে সাময়িকভাবে আড়াল করে, তখন সেই ঘটনাকে অকাল্টেশন বলা হয়।
এই ঘটনায় চাঁদ পৃথিবীর তুলনামূলকভাবে কাছের মহাজাগতিক প্রতিবেশী হওয়ায় তার পেছনে থাকা শুক্র গ্রহকে কিছু সময়ের জন্য দেখা যায়নি। চাঁদ তার কক্ষপথে চলতে চলতে পৃথিবী ও শুক্রের আপাত অবস্থানের এমন একটি বিন্দুতে চলে আসে, যেখানে পৃথিবী থেকে দেখলে শুক্র চাঁদের আড়ালে চলে যায়।
এরপর চাঁদের আপাত অবস্থান পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুক্র গ্রহটি আবার চাঁদের অপর পাশ দিয়ে দৃশ্যমান হয়। এই দুই পর্যায়কে বলা যায় ‘অ্যাপ্রোচ’ বা আড়ালে যাওয়ার সময় এবং ‘রিঅ্যাপিয়ারেন্স’ বা পুনরায় দৃশ্যমান হওয়ার সময়।
এ দিনের দৃশ্যের আরেকটি বিশেষত্ব ছিল চাঁদ ও শুক্রের আলোকিত অংশের আকৃতি। পর্যবেক্ষকের চোখে দুটির আলোকিত অংশ প্রায় একই ধরনের মনে হওয়ায় আকাশে বড় একটি চাঁদের পাশে ছোট আরেকটি চাঁদ দেখা যাচ্ছে—এমন অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
তবে শুক্র গ্রহ কোনো দ্বিতীয় চাঁদ নয়। শুক্র সৌরজগতের একটি গ্রহ এবং আকারে পৃথিবীর কাছাকাছি হলেও পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব চাঁদের তুলনায় অনেক বেশি। শুক্র নিজে আলো তৈরি করে না; সূর্যের আলো প্রতিফলিত হওয়ার কারণেই রাতের আকাশে তাকে এত উজ্জ্বল দেখা যায়।
শুক্রকে অনেক সময় ‘সন্ধ্যাতারা’ বা ‘ভোরের তারা’ বলা হয়। আসলে এটি কোনো তারা নয়, একটি গ্রহ। পৃথিবী ও সূর্যের তুলনামূলক অবস্থানের কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে অথবা সূর্যোদয়ের আগে পূর্ব আকাশে শুক্রকে উজ্জ্বল বিন্দু হিসেবে দেখা যায়।
চাঁদের আড়ালে শুক্রের এই অদৃশ্য হওয়া এবং পুনরায় আবির্ভূত হওয়ার দৃশ্য তাই শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি পৃথিবী, চাঁদ ও শুক্রের পারস্পরিক অবস্থান এবং কক্ষপথগত গতিবিধির একটি চমৎকার দৃশ্যমান উদাহরণ।
ঢাকার আকাশ থেকে ঘটনাটি পর্যবেক্ষণকারী একজন আকাশপ্রেমী পুরো ঘটনার অনেক ছবি ও ভিডিও ধারণ করেছেন। এর মধ্যে শুক্র গ্রহের চাঁদের আড়াল থেকে পুনরায় বেরিয়ে আসার একটি ফ্রেমও ধারণ করা হয়েছে।
মহাকাশের অনেক ঘটনা খালি চোখে দেখা যায় না কিংবা দেখতে অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু চাঁদ ও শুক্রের মতো উজ্জ্বল মহাজাগতিক বস্তুর এমন কাছাকাছি আপাত অবস্থান সাধারণ মানুষের মধ্যেও জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ তৈরি করে।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে রাতের আকাশে কৃত্রিম আলোর আধিক্য থাকলেও চাঁদ ও শুক্রের মতো উজ্জ্বল বস্তু সাধারণত তুলনামূলকভাবে সহজে নজরে আসে। তাই এমন কোনো মহাজাগতিক ঘটনা ঘটলে শহরের মানুষও তা সরাসরি উপভোগ করার সুযোগ পান।
চাঁদের আড়ালে শুক্রের হারিয়ে যাওয়া এবং আবার ফিরে আসার এই দৃশ্য কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আকাশের একটি স্থির ছবিকে যেন জীবন্ত করে তুলেছিল। পৃথিবীর ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও সন্ধ্যার আকাশে ঘটে যাওয়া এই মহাজাগতিক মুহূর্ত মনে করিয়ে দিয়েছে—আমাদের মাথার ওপরের আকাশ প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের কিছু মুহূর্ত কখনো কখনো হয়ে ওঠে সত্যিই অসাধারণ।



