জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত ২১৯ বছরের পুরোনো দুটি বাংলা দলিলে উঠে এসেছে দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষকে বিক্রি করে দেওয়ার নির্মম বাস্তবতার ইতিহাস।
জাতীয় জাদুঘরের তৃতীয় তলায় ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগের ৩৩ নম্বর গ্যালারিতে কাচের বাক্সে সংরক্ষিত রয়েছে পুরোনো পাণ্ডুলিপি, মুদ্রা ও বিভিন্ন সময়ের ঐতিহাসিক দলিল। সেখানেই পাশাপাশি রাখা হয়েছে বাংলা ভাষায় লেখা দুটি দুর্লভ দলিল। একটির শিরোনাম ‘মানুষ বিক্রির দলিল’, অন্যটির ‘আত্মবিক্রয় দলিল’।
প্রথম দলিলটির বয়স ২১৯ বছর। এতে দেখা যায়, ১৮০৭ সালে তৎকালীন ময়মনসিংহ পরগনার হাসানপুর চাকলার বাসিন্দা সদারাম দাস তাঁর ছয় বছর বয়সী মেয়েকে কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতির কাছে বিক্রি করেন। বিনিময়ে তিনি পান ১৩ টাকা সিক্কা।
দলিলটির একটি অংশ সময়ের ব্যবধানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে পুরো লেখা পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এবং বিক্রি হওয়া মেয়েটির নামও জানা যায়নি। পরবর্তী জীবনে তাঁর কী হয়েছিল, সেটিও জানা যায়নি।
তবে যতটুকু লেখা পাঠোদ্ধার করা গেছে, তাতে শুধু শিশুটিকে বিক্রির বিষয়ই উল্লেখ নেই। দলিলে বলা হয়েছে, মেয়েটির ওপর ক্রেতা কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতি, তাঁর ছেলে এবং বংশধরদের অধিকার থাকবে। এমনকি মেয়েটির ভবিষ্যৎ সন্তানদেরও ওই অধিকারের আওতায় রাখা হয়েছিল।
অর্থাৎ দলিলটি শুধু একজন শিশুকে বিক্রির নথি ছিল না। এতে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও মালিকানার দাবি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল।
মেয়েটিকে কেন বিক্রি করা হয়েছিল, তার স্পষ্ট কারণ দলিলে পাওয়া যায় না। তবে পুরোনো বাংলা দলিলপত্র ও তৎকালীন বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে গবেষণার সঙ্গে মিলিয়ে দারিদ্র্য ও ঋণের মতো অর্থনৈতিক কারণের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
দলিলটি পাঠোদ্ধারে সহযোগিতা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও পুরোনো বাংলা দলিলপত্র-পাণ্ডুলিপির গবেষক নাজমুল হোসেন।
এর ঠিক এক বছর পরের ঘটনা দ্বিতীয় দলিলে। ১৮০৮ সালের ওই আত্মবিক্রয় দলিলে দেখা যায়, ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের মরিচালি গ্রামের সেখ মামুদা স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ নিজেকে বিক্রি করেন কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতির কাছে।
দুই সন্তানের নাম ছিল সেখ দুতিয়া ও সেখ কাঙ্গালিয়া। চারজনের বিনিময়ে সেখ মামুদা পেয়েছিলেন সাড়ে তিন টাকা সিক্কা।
এই দলিলে বিক্রির কারণ হিসেবে খাবার ও কাপড়ের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ অভাবের চাপে সেখ মামুদাকে নিজের স্বাধীনতার পাশাপাশি স্ত্রী ও দুই সন্তানকেও অন্যের হাতে তুলে দিতে হয়েছিল।
দলিলের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু সেখ মামুদা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরাই নন, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মও এই বিক্রির আওতায় ছিল। ক্রেতা কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতি চাইলে তাঁদের বিক্রি বা দান করতে পারতেন।
জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত এই দুটি দলিল নিয়ে ২০২৫ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। গবেষণাপত্রটির নাম ‘উনিশ শতকের বাংলায় দাসপ্রথার চর্চা অনুসন্ধান: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত দুটি অপ্রকাশিত মানুষ বিক্রির দলিল থেকে পাওয়া তথ্য’।
গবেষণায় সেখ মামুদার দলিলটি বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, পরিবারের অন্ন-বস্ত্রের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করেই তিনি নিজেকে ও তাঁর পরিবারকে বিক্রি করেছিলেন। বিনিময়ে পাওয়া সাড়ে তিন সিক্কা এবং চুক্তির শর্তে তাঁদের ভবিষ্যৎ বংশধরদেরও এই ব্যবস্থার আওতায় রাখা হয়েছিল।
বাংলায় মানুষ বিক্রির ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় এমন আরও দলিলের উল্লেখ পাওয়া যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও গবেষক মুহাম্মদ শাহজাহান মিয়া তাঁর ‘পুরোনো বাংলা দলিলপত্র ১৬৩৮-১৮৮২’ বইয়ে বাংলায় মানুষ বিক্রির দলিলের কথা উল্লেখ করেছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে দুর্ভিক্ষ, বন্যা বা প্লাবনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে দরিদ্র মানুষের অনেকেরই বেঁচে থাকার উপায় থাকত না। অনাহার থেকে বাঁচার শেষ চেষ্টা হিসেবে কেউ কেউ নিজেকে অথবা স্ত্রী-সন্তানকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিতেন। এসব ঐতিহাসিক দলিল তৎকালীন দরিদ্র মানুষের জীবন ও ক্রীতদাস প্রথার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
দাসপ্রথার ইতিহাসের সঙ্গে সাধারণত আফ্রিকা থেকে জাহাজে করে মানুষকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার ইতিহাস এবং ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক আমলের ট্রান্স-আটলান্টিক দাস বাণিজ্যের প্রসঙ্গ সামনে আসে। ওই বাণিজ্যের মাধ্যমে আফ্রিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষকে জোর করে আমেরিকা ও ইউরোপের উপনিবেশগুলোতে নিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল।
দাসপ্রথা ও দাস ব্যবসা বহু শতাব্দী ধরে চললেও ১৮ শতক থেকে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরালো হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে দাসপ্রথা বিলুপ্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়।
তবে দাস কেনাবেচা শুধু আটলান্টিকের ওপারের ঘটনা ছিল না। বাংলাতেও স্থানীয় মানুষকে দাস হিসেবে কেনাবেচার প্রমাণ পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময়ের নথি, পর্যটকদের বিবরণ ও গবেষণায় স্থানীয় মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রির তথ্য উঠে এসেছে।
প্রয়াত অর্থনীতিবিদ আকবর আলি খান তাঁর ‘দারিদ্র্যের অর্থনীতি: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ বইয়ের ‘বাংলার দাসপ্রথা’ প্রবন্ধে বাংলার দাসপ্রথা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
কোনো কোনো ঐতিহাসিকের ধারণা ছিল, বাংলায় ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন পরিস্থিতি ছিল এবং এখানে শুধু বিদেশ থেকে আনা দাসদের কেনাবেচা হতো, স্থানীয় মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হতো না। আকবর আলি খান এ ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে লিখেছেন, ‘বাংলায় ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক কম দামে দাস বিক্রি হতো।’
আকবর আলি খানের বিশ্লেষণে ১২টি দাস বিক্রির দলিলের কথা উঠে এসেছে। এসব দলিলে বিক্রি হওয়া ব্যক্তিরা সবাই বাংলার স্থানীয় বাসিন্দা ছিলেন। তাঁরা বাইরে থেকে আনা মানুষ ছিলেন না।
তাঁর বিশ্লেষণে দাস হিসেবে বিক্রি হওয়া মানুষের চারটি শ্রেণির তথ্য পাওয়া যায়। এগুলো হলো নিঃস্ব স্বাধীন ব্যক্তি, স্বাধীন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল শিশু, আগে কেনা দাস এবং দাসদের সন্তান।
অর্থাৎ তৎকালীন বাংলায় দাসপ্রথা শুধু যুদ্ধবন্দী বা বিদেশ থেকে ধরে আনা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দারিদ্র্য ও নির্ভরশীলতার কারণেও স্বাধীন মানুষ এই ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়তেন।
ইতিহাসবিদ ইন্দ্রাণী চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘দাসপ্রথা ও বাংলার গৃহস্থালি, ১৭৭০-১৮৮০’-তে তৎকালীন নথি ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ময়মনসিংহ, ঢাকা ও সিলেট থেকে ছেলে ও মেয়েশিশুদের কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। ইউরোপীয়দের অনেকেই তখন কম দামে এসব শিশু কিনে গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করতেন।
জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত মানুষ বিক্রির দুটি দলিলও বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। ১৯৮০ সালে ময়মনসিংহের গৌরীপুরের দৌহাখোলা গ্রামের সুরেন্দ্র চন্দ্র লস্করের কাছ থেকে দলিল দুটি সংগ্রহ করা হয়। এরপর থেকে এগুলো জাতীয় জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগে সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত হচ্ছে।
১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাণ্ডুলিপি শাখায় বসে দলিল দুটি পড়েন বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজমুল হোসেন।
পাঠোদ্ধারে তিনি জানান, দলিল দুটি তুলট কাগজে বাংলা ভাষায় লেখা। প্রথম দলিলটি ১২১৪ বঙ্গাব্দের ৩ শ্রাবণ, অর্থাৎ ১৮০৭ সালের। সময়ের ব্যবধানে প্রথম দলিলটির কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বিক্রি হওয়া মেয়েটির নাম জানা যায়নি। পরে তাঁর কী হয়েছিল, সেটিও জানা যায়নি।
দ্বিতীয় দলিলটি প্রথমটির তুলনায় কিছুটা স্পষ্ট হওয়ায় এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে বেশি তথ্য পাওয়া গেছে।
জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত এই দুটি দলিলের বাইরে বাংলায় মানুষ বিক্রির আরও বহু ঐতিহাসিক নথির উল্লেখ পাওয়া যায়।
২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সিলেট সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিসের মহাফেজখানা থেকে পাওয়া ১৮০৬ ও ১৮০৭ সালের কয়েকটি দলিলের তথ্য উঠে আসে। সেখানে শেখ বিআনিয়া ১০ রুপিতে নিজেকে বিক্রি করেছিলেন। ১৭ বছর বয়সী গনাই ভান্ডারির দাম ছিল ২৫ টাকা। ভূবিদাসী ও তাঁর ছেলে সনাইকে বিক্রি করা হয়েছিল ২৮ টাকায়।
কোনো কোনো দলিলে ঋণ পরিশোধের কথা উল্লেখ ছিল। আবার কোনো দলিলে বিক্রি হওয়া ব্যক্তির পরবর্তী প্রজন্মও একই মালিকের অধীনে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
১৭৯০ সালের আরেকটি নথিতে দেখা যায়, অভাবের কারণে চার বছর বয়সী শিশু জমিয়তকে পাঁচ কাহন কড়িতে বিক্রি করা হয়েছিল।
সিলেটের ভাষাসৈনিক মতিন উদ্দিন আহমদ জাদুঘরেও মানুষ বিক্রির আরেকটি দলিল রয়েছে। ১৮৩৬ সালের ওই নথিতে জকিগঞ্জের ১২ বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে ১১ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাফেজখানায় ১৬৪৯ থেকে ১৭৫৪ সালের মধ্যে বিক্রি হওয়া ১৯ জনের একটি তালিকার উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে ১২ জনের ক্ষেত্রে অনাহারকে বিক্রির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও মানুষ বিক্রির একটি দলিল সংরক্ষিত আছে। গাছের বাকলে লেখা ওই দলিলটির বয়স প্রায় ৩৮৮ বছর। এর পাঠোদ্ধার করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মুহাম্মদ শাহজাহান মিয়া।
মানুষ বিক্রির দলিল দুটি ছাড়াও জাতীয় জাদুঘরে রয়েছে আরও বহু দুর্লভ ঐতিহাসিক নিদর্শন। জাতীয় জাদুঘরের জনশিক্ষা বিভাগের কিপার আসমা ফেরদৌসীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জাদুঘরে এক লাখের বেশি নিদর্শন সংগৃহীত ও সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে দর্শকদের জন্য প্রদর্শন করা হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার নিদর্শন।



