রাজধানীর গুলশান, বনানী ও উত্তরাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বার ও অ্যালকোহল পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো রাত ১১টার মধ্যে বন্ধ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থমূলক রিট করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ও ন্যাশনাল লইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস. এম. জুলফিকুর আলী জুনু পিটিশনার-ইন-পার্সন হিসেবে রিটটি দায়ের করেন।
রিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের মহাপরিচালক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনারকে বিবাদী করা হয়েছে।
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, যেসব বার বা অ্যালকোহল পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠানের বৈধ লাইসেন্স, সরকারি প্রজ্ঞাপন, আদেশ, বিধি বা অন্য কোনো আইনগত নথিতে বন্ধের নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ রয়েছে, সেই সময় কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
একই সঙ্গে, দেশে সব বারের জন্য অভিন্ন জাতীয় বন্ধের সময় না থাকলে রাত ১১টার মধ্যে বার বন্ধ ও অ্যালকোহল পরিবেশন বন্ধের একটি অভিন্ন নীতি চালুর বিষয়টি পরীক্ষা, বিবেচনা ও আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
রিটে স্পষ্ট করা হয়েছে, বর্তমানে সারা দেশের সব বারের জন্য রাত ১১টা বাধ্যতামূলক বন্ধের সময়—এমন দাবি করা হয়নি। বরং যেখানে আইনগতভাবে ১১টা বা অন্য কোনো সময় নির্ধারিত রয়েছে, তা বাস্তবায়ন এবং অভিন্ন সময় না থাকলে রাত ১১টার নীতি প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনার আবেদন করা হয়েছে।
অবৈধ অ্যালকোহল বিক্রির অভিযোগ
রিট আবেদনে গুলশান, বনানী ও উত্তরাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিছু বার, ক্লাব, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিনোদনকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স বা অনুমোদন ছাড়া মদ বিক্রি ও পরিবেশন, লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন এবং প্রয়োজনীয় কনজাম্পশন পারমিট ছাড়া ব্যক্তিদের কাছে অ্যালকোহল বিক্রির অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
এসব অভিযোগ আইনসম্মত তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
রিটে আরও বলা হয়েছে, কোনো হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্লাব বা বিনোদনকেন্দ্র পরিচালনার সাধারণ অনুমোদন থাকলেই সেটি মদ বিক্রি বা পরিবেশনের লাইসেন্স হিসেবে গণ্য হবে না। আইন অনুযায়ী পৃথক অ্যালকোহল লাইসেন্স বা অনুমোদন প্রয়োজন হলে তা থাকতে হবে।
চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকি তদন্তের আবেদন
চোরাচালানের মাধ্যমে আনা, অবৈধভাবে আমদানি করা, অঘোষিত বা শুল্ক পরিশোধ না করা অ্যালকোহল সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বিক্রির অভিযোগ তদন্তে কাস্টমস ও রাজস্ব কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ বা যুক্তিসঙ্গত কারণ পাওয়া গেলে আমদানির কাগজপত্র, ক্রয় চালান, কাস্টমস ডিক্লারেশন, শুল্ক পরিশোধের নথি, স্টক রেজিস্টার, ব্র্যান্ড নিবন্ধন ও রিলিজ অর্ডারসহ প্রয়োজনীয় নথি যাচাইয়ের আবেদন করা হয়েছে।
তদন্তে কোনো অ্যালকোহল আইন অনুযায়ী অবৈধ বা জব্দযোগ্য প্রমাণিত হলে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তা জব্দের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
গুলশান, বনানী ও উত্তরায় নজরদারির আবেদন
রিটে গুলশান, বনানী ও উত্তরার অ্যালকোহল পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত নজরদারি ও পরিদর্শনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিদর্শনের সময় লাইসেন্সের বৈধতা ও নবায়ন, অনুমোদিত স্থান, কার্যক্রমের সীমা, কোটা বা অনুমোদিত পরিমাণ এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত যাচাইয়ের আবেদন করা হয়েছে। রাজধানীর বাইরে সারা দেশেও একই ধরনের আইনসম্মত নজরদারি নিশ্চিত করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
ডিজে অনুষ্ঠান নিয়েও নির্দেশনা
কিছু হোটেল, ক্লাব, বার ও বিনোদনকেন্দ্রে অনুমোদনহীন ডিজে অনুষ্ঠান বা অন্যান্য বিনোদনমূলক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে শুধু সাধারণ অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি না দিয়ে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স, অনুমতি, জনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধান বা দণ্ডবিধির কোনো বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণের আবেদন করা হয়েছে।
আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের আবেদন
অবৈধ মদ ব্যবসা, চোরাচালান, শুল্ক ফাঁকি ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পুলিশ, ঢাকা মহানগর পুলিশ, সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও কাস্টমসের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
রিটে বলা হয়েছে, প্রতিটি সংস্থা তাদের নিজ নিজ আইনগত এখতিয়ারের মধ্যে থেকেই ব্যবস্থা নেবে।
এ ছাড়া বৈধভাবে অ্যালকোহল বিক্রি বা পরিবেশনের অনুমতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ সরকারি রেকর্ড সংরক্ষণ, নিয়মিত ও ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন, আইন লঙ্ঘন প্রমাণিত হলে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ফৌজদারি তদন্ত ও মামলা করার নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
সাধারণ জনগণ যাতে অবৈধ বার, পারমিট ছাড়া মদ বিক্রি, চোরাচালান বা শুল্ক ফাঁকির বিষয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন, সে জন্য একটি স্বচ্ছ জনঅভিযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা বা শক্তিশালী করার আবেদন করা হয়েছে।
কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে
রিট আবেদনকারী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশনাও চেয়েছেন।
ওই প্রতিবেদনে কতটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়েছে, কতটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছিল না, কতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, কত পরিমাণ অ্যালকোহল জব্দ করা হয়েছে এবং চোরাচালান বা শুল্ক ফাঁকির কতটি অভিযোগ তদন্ত ও মামলা হয়েছে—এসব তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করা হয়েছে।
রিট নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত গুলশান, বনানী ও উত্তরায় বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ, গোয়েন্দা তথ্য বা অন্য কোনো আইনসম্মত ভিত্তি পাওয়া গেলে সন্দেহভাজন অনুমোদনহীন অ্যালকোহল পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।



