সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবনে হামলার পর আগুন ধরে যায়। একই সময়ে রাজধানী রিয়াদে হুতিদের ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ পড়ে চারজন আহত হয়েছেন এবং ১৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ধাহরানে আরামকোর প্রশাসনিক ভবনে হামলার ঘটনা ঘটে। সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এসপিএ জানায়, হামলার পর ভবনটিতে আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে এ ঘটনায় কেউ নিহত বা আহত হননি বলে মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
আরামকোর ভবনে হামলার আগে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোর আশপাশে অবস্থানরত কর্মী ও বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছিল হুতিরা। গোষ্ঠীটি এসব স্থাপনাকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে উল্লেখ করে।
হুতিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারির এই সতর্কবার্তার আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আল-সাবাহ কেন্দ্রীয় তেল স্থাপনা থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। জোটের ওই নির্দেশের জবাবে সারি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সানায় হামলা চালানো হলে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ‘কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক’ পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
এদিকে রিয়াদের দিকে ছোড়া হুতিদের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে সৌদি আরব। এসপিএর বরাতে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের মুখপাত্র জানান, ক্ষেপণাস্ত্র দুটির ধ্বংসাবশেষ পড়ে চারজন আহত হয়েছেন। এতে ১৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বাড়িগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশে ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হুঁশিয়ারির কিছুক্ষণ পর ইয়েমেনের রাজধানী সানায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানান ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকেরা। হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর বিমান হামলায় রাজধানীর আল-সাবাহ এলাকার একটি তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হামলার আশঙ্কায় ইয়েমেনের তেল কোম্পানি তাদের তেল সংরক্ষণাগারগুলো খালি রাখার কথা জানিয়েছিল। কোম্পানিটির বক্তব্য অনুযায়ী, এতে সৌদি হামলার ফলে তেলের মজুত কিংবা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে সরবরাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা কম ছিল। তবে তেলের সংকট দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় সানার কয়েকটি পেট্রলপাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
আল-জাজিরার সংবাদদাতা ইউসুফ মাওরি জানান, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সানার আল-সাবাহ কেন্দ্রীয় তেল স্থাপনায় হামলা চালানোর সময় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব ইয়েমেনের রাস ইসা বন্দরে তেল সংরক্ষণের ট্যাংক লক্ষ্য করে আরও দুই দফায় বিমান হামলা চালায়। এ ছাড়া হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা হোদেইদা প্রদেশের একটি তেল স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি অভিযোগ করেন, হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের অস্ত্রভান্ডার হিসেবে ওই স্থাপনা এবং এর ভূগর্ভস্থ জ্বালানি ডিপো ব্যবহার করছে।
সানায় বিস্ফোরণের খবর প্রকাশের পর ইয়াহিয়া সারি জানান, সেখানে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে হুতি যোদ্ধাদের সংঘর্ষ চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সানায় হামলা চালালে যেসব স্থাপনা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে হামলা চালাবে হুতিরা।
এর আগে মঙ্গলবার সৌদি আরবের ধাহরানে আরামকোর সদর দপ্তর, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং আরামকোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি তেল শোধনাগারের আশপাশ থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট আল-খারজ এলাকায় হুতিদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মধ্যেই এ ঘটনা ঘটে।
ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলা এবং এর জবাবে সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের হামলার ঘটনায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। তবে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ক্ষয়ক্ষতি এবং হতাহতের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।



