পরীক্ষামূলক সংস্করণ

সাগর-রুনি হত্যা: ১৪ বছরেও মেলেনি খুনিদের পরিচয়

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পার হলেও এখনো খুনিদের শনাক্ত করা যায়নি। জানা যায়নি হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্যও (মোটিভ)। দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত চললেও চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থাগুলো।

গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় একটি টাস্কফোর্স। প্রায় দুই বছর ধরে তদন্ত চালিয়েও হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। সম্প্রতি হাইকোর্টে দাখিল করা তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে তদন্তের নানা সীমাবদ্ধতা।

তদন্তে নতুন তথ্যের দাবি, তথ্য চেয়েছে পিবিআই

গত আগস্টে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা এক বক্তব্যে দাবি করেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র‍্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ও একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। জিয়াউল আহসানের এক সহকারীকে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কোনো সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

সাংবাদিক দম্পতি হত্যার তদন্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয় কী তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে, তা জানতে চিফ প্রসিকিউটরকে চিঠি দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে, তাদের তদন্তকাজ শেষ হলে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত টাস্কফোর্সের তদন্তকারীর কাছে হস্তান্তর করা হবে।

তদন্ত শেষ করতে আরও ছয় মাস সময়

মঙ্গলবার হাইকোর্টে ২৭ পৃষ্ঠার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করে টাস্কফোর্স। তদন্ত শেষ করতে এক বছর সময় চাওয়া হলেও শুনানি শেষে বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের দ্বৈত বেঞ্চ ছয় মাস সময় মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে আগামী ২৯ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করা হয়। ওই দিন প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহাকে আদালতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।

এর আগে টাস্কফোর্স উচ্চ আদালত থেকে ছয় মাস করে তিন দফা সময় নিয়েছিল। তারপরও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়নি।

রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পড়ে শোনান। বাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী শিশির মনির।

পরে সংবাদ সম্মেলনে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত, তা নিয়ে সরকারের গোপন করার কিছু নেই এবং কাউকে রক্ষা করারও কোনো উদ্যোগ নেই। প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসার জন্য সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলাটির তদন্তে যুক্ত থাকা অনেক কর্মকর্তাকে এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এতে তদন্তের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডে তাড়াহুড়ো করেনি খুনিরা

টাস্কফোর্সের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহের কারণে সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি খুন হননি। একজনকে হত্যার পর অপরজন আত্মহত্যা করেছেন, এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দুজনকেই হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ক্রাইমসিন ও নিহতদের শরীরের ক্ষত পর্যবেক্ষণ করে টাস্কফোর্সের ধারণা, হত্যাকাণ্ড সংঘটনের সময় খুনিরা তাড়াহুড়ো করেনি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের তথ্য অনুযায়ী, দুজনের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে উল্লেখযোগ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তবে তাঁদের শরীরে একাধিক ক্ষত ছিল, যা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণ হতে পারে। ঘাড়, পিঠ ও চোখের নিচেও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

টাস্কফোর্সের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ক্ষত ও রক্তক্ষরণের ধরন দেখে মনে হয়েছে, মৃত্যুর আগে তাঁরা বেশ কিছুক্ষণ জীবিত ছিলেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে হত্যাকারীদের পেশাদার হওয়ার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।

চুরি হওয়া মোবাইল ও ল্যাপটপ উদ্ধার হয়নি

টাস্কফোর্স জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর লুট হওয়া মোবাইল ফোন ও দুটি ল্যাপটপ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, ডিএমপির ডিবিপ্রধান মনিরুল ইসলাম, র‍্যাবের মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একজন সাংবাদিককে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছে টাস্কফোর্স।

শরীরে চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব মেলেনি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্ববর্তী তদন্তকারীরা ১৬৭ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নিয়েছিলেন। বর্তমান তদন্তকালে আরও ৯০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে ২৪ জনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া মামলার সন্দেহভাজন আটজনকে আগের তদন্তকারীরা গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে বিবেচিত ৪৭ ধরনের আলামতও জব্দ করা হয়েছিল।

নিহতদের ময়নাতদন্তের সময় ভিসেরা সংরক্ষণ করা হয়নি। পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে কবর থেকে মরদেহ তুলে পুনরায় ভিসেরা সংগ্রহ করা হয়। চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব পরীক্ষা করতে নমুনাগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়। প্রাপ্ত ভিসেরা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে শরীরে চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে টাস্কফোর্স।

ডিএনএ পরীক্ষায় দুই অজ্ঞাত পুরুষের পরিচয় মেলেনি

হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি, বঁটি, ছুরির বাট, নিহতদের পোশাকসহ বিভিন্ন আলামত এবং ২৫ জনের মুখের ভেতরের কোষ থেকে সংগৃহীত নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডসের পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছিল। আলামতে পাওয়া ডিএনএর সঙ্গে নমুনা দেওয়া ব্যক্তিদের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়নি বলে পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে চারজনের ডিএনএ পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনির ডিএনএ শনাক্ত করা হয়েছে। বাকি দুইজন অজ্ঞাত পুরুষের পরিচয় এখনো উদ্ঘাটন করা যায়নি।

এ ছাড়া আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসা থেকে উদ্ধার করা প্রায় ৩০০টি সিডিতে কথোপকথন, ভিডিও, অডিও ও অপরাধসংক্রান্ত তথ্য থাকতে পারে। এর মধ্যে ৯০টি সিডি মূল্যায়ন করা হয়েছে। বাকি ২১০টি সিডি পর্যালোচনার কাজ এখনো শেষ হয়নি।

২০১২ সাল থেকে তদন্ত চলছে

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি। পরদিন সকালে তাঁদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই দিনই রুনির ভাই নওশের আলী রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।

প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানা চার দিন মামলাটি তদন্ত করে। এরপর তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), যারা ৬৩ দিন তদন্ত চালায়। পরে হাইকোর্টের আদেশে মামলার তদন্তভার র‍্যাবের কাছে যায়। ২০১২ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত টানা ১২ বছর ৬ মাস ১৬ দিন তদন্ত করে র‍্যাব।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হাইকোর্টের আদেশে মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় টাস্কফোর্স। এর আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন পিবিআই প্রধান। সদস্য হিসেবে সিআইডি, র‍্যাব ও পুলিশ সদরদপ্তরের একজন করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন।

দীর্ঘ ১৪ বছরেও খুনিদের পরিচয় ও হত্যার উদ্দেশ্য নিশ্চিত না হওয়ায় সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

প্রধান খবর

স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ৪৬

স্পেনের তোলেদো প্রদেশে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন বহু যাত্রী। উদ্ধারকাজ চলছে এবং নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্পেনে দুই উচ্চগতির ট্রেনের সংঘর্ষ, নিহত ১০

স্পেনের টোলেডো প্রদেশে দুই উচ্চগতির ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। বুধবার সকালের এ দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদ ও আন্দালুসিয়ার মধ্যে রেল চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সাগর-রুনি হত্যা: ১৪ বছরেও মেলেনি খুনিদের পরিচয়

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলায় ১৪ বছরেও খুনিদের পরিচয় ও হত্যার উদ্দেশ্য নিশ্চিত হয়নি। তদন্ত শেষ করতে টাস্কফোর্সকে আরও ছয় মাস সময় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আসছে...