অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে সোমবার (২৭ এপ্রিল) দিনব্যাপী তীব্র আলোচনা, মতবিনিময় এবং একাধিক ইস্যুতে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্রপতির ভাষণ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান, ছাত্র রাজনীতি, জুলাই সনদ এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রশ্নে সংসদ সদস্যদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য উঠে আসে।
সরকারি দলের হুইপ রকিবুল ইসলাম আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীরা এখন ক্যাম্পাসে “গুপ্ত রাজনীতি” দেখতে চায় না। তার মতে, শিক্ষার্থীদের দাবি হলো—সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রকাশ্য ও স্বচ্ছ হতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, গুপ্তভাবে কোনো ধরনের সংগঠিত অস্থিরতা বা “মব তৈরি” করে ক্যাম্পাসে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকর হবে এবং শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করবে।
অন্যদিকে, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ওই সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল একসঙ্গে অবস্থান নিয়েছিল এবং আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। তিনি দাবি করেন, আন্দোলন দমনে কঠোর দমননীতি, সহিংসতা এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল, যা ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন, রূপান্তরের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ঐকমত্য ছাড়া এগোনো উচিত নয়।
জাতীয় নাগরিক পার্টির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জনগণ একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্র চেয়েছিল, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী রাজনৈতিক কাঠামোতে গণতন্ত্র দুর্বল ছিল এবং সংবিধানে এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা ফ্যাসিবাদী শাসনের সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার ছাড়া জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জনগণ কোনো ফ্যাসিবাদী বা তার সহযোগীদের ধন্যবাদ জানানোর জন্য ভোট দেয়নি। তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে বলেন, এতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে বা পরিবর্তন করা হয়েছে, যা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
একই দলের আরেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান না থাকলে তা রাষ্ট্রীয় ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিএনপির এক সংসদ সদস্যের বক্তব্যকে ঘিরে অধিবেশনে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। তিনি জুলাই সনদকে “অপ্রয়োজনীয়” বলে মন্তব্য করলে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি করেন। মুহূর্তেই সংসদে হইচই শুরু হয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পিকার হস্তক্ষেপ করেন।
পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদ হলো মত প্রকাশের সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক জায়গা, এখানে ভিন্নমত থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সবার দায়িত্ব। পরে নামাজের বিরতি ঘোষণা করা হলে অধিবেশন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
বিরতির পর চিফ হুইপ জানান, বক্তব্যের ব্যাখ্যায় ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে এবং তা প্রয়োজনে রেকর্ড থেকে সংশোধন বা এক্সপাঞ্জ করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। পরে ডেপুটি স্পিকার জানান, পুরো বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



