অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক
দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ বা চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে জাতীয় জিডিপিতে এ খাতের অবদান ১৫ শতাংশে উন্নীত করার এক মেগা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সাথে কেবল গ্রাহকসংখ্যা বৃদ্ধিই নয়, বরং ইন্টারনেট ও সেবার মানের সূচকেও বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দেশের তালিকায় নিয়ে আসতে একটি সুনির্দিষ্ট ও যুগান্তকারী রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে।
আজ শনিবার (১৬ মে) রাজধানীর তারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ’ (টিআরএনবি) কর্তৃক আয়োজিত ‘টেলিকম খাতের ভবিষ্যৎ: নতুন সরকার কী ভাবছে’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর টেলিকম ও আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এই বড় পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী দেশের জিডিপিতে টেলিকম ও আইসিটি খাতের অবদান মাত্র ১ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে সঠিক নীতিমালার প্রণয়ন, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং খাত সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই অবদানকে খুব দ্রুতই দ্বিগুণ বা তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব; তাই জিডিপিতে ১৫ শতাংশ অবদানের এই লক্ষ্যটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত।
আইসিটি উপদেষ্টা সেবার মানের চরম বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে মোবাইল ও ফিক্সড লাইনের সামগ্রিক গ্রাহকসংখ্যায় বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দেশের অন্যতম হলেও সেবার মানের বৈশ্বিক সূচকে আমাদের অবস্থান এখনো ৯০-এর পরে। এই অবস্থান পরিবর্তন করে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সেবার মানকেও শীর্ষ ২০-এ উন্নীত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। মোবাইল অপারেটরদের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত কর কাঠামো নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে মোবাইল অপারেটরদের কার্যকর করহার প্রায় ৫৫ থেকে ৫৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড় করহার ২২ শতাংশের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। সরকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হওয়ায় রাতারাতি কর কমানো বেশ বড় চ্যালেঞ্জিং। তা সত্ত্বেও আসন্ন জাতীয় বাজেটে সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থ ও সুবিধার কথা সর্বোচ্চ মাথায় রেখে কর কাঠামোতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
দেশে বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের বিষয়ে উপদেষ্টা আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে এফডিআই-জিডিপি অনুপাত মাত্র শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডে অত্যন্ত হতাশাজনক। এই অচলাবস্থা কাটাতে এবং টেলিকম ও আইসিটি খাতে বড় বড় বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসতে সরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নীতির রোডম্যাপ ঘোষণা করবে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা বা ব্যবসায়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। দেশের ডিজিটাল বিভাজন দূর করতে এবং ৪জি ও ৫জি প্রযুক্তির সর্বোচ্চ বিস্তার ঘটাতে স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে রেহান আসিফ বলেন, দেশে এখনো স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর হার মাত্র ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। তাই সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে আধুনিক স্মার্টফোন বাজারে আনার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি সাধারণ মানুষ যাতে সহজ কিস্তিতে (ইএমআই) স্মার্টফোন কিনতে পারেন, সে জন্য মোবাইল অপারেটর ও ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা চলছে।
সরকারের স্পেকট্রাম বা তরঙ্গ নীতি নিয়ে উপদেষ্টা স্পষ্ট করেন যে, সরকারের মূল লক্ষ্য শুধু স্পেকট্রাম উচ্চমূল্যে বিক্রি করে সাময়িক রাজস্ব আয় করা নয়; বরং দেশের অর্থনীতিতে এর বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব নিশ্চিত করাই মূল অগ্রাধিকার। এর পাশাপাশি আধুনিক ডেটা সেন্টার স্থাপন, কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক, ক্লাউড অবকাঠামো এবং সাইবার নিরাপত্তাকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সাইবার নিরাপত্তা খাতে বর্তমান অবস্থান থেকে বাংলাদেশকে আরও অনেক দূর এগোতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের সাধারণ গ্রাহক, সরকারি অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক অবকাঠামো সুরক্ষায় সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দ্রুত উন্নয়নকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের আইটি ফ্রিল্যান্সার ও স্টার্ট-আপ উদ্যোক্তাদের জন্য নীতিগত সহায়তা, আন্তর্জাতিক মানের কর্মপরিসর, বিশেষ অনুদান এবং সহজ শর্তে ঋণসহ সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা অনেক গুণ বাড়ানো হবে। ছোট উদ্যোক্তাদের কয়েক লাখ টাকার বীজ তহবিল থেকে শুরু করে বড় স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানের কোটি টাকার ‘স্কেল-আপ’ বা ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য সরকারের বিশেষ আর্থিক পরিকল্পনা রয়েছে।
উপদেষ্টা তার বক্তব্যের শেষাংশে দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের মানুষের বর্তমান গড় বয়স মাত্র ২৭ বছর। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, তাদের প্রখর উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে যদি আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি, তবে আগামী পাঁচ বছরে টেলিকম ও আইসিটি খাত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেবে। ২০৪৮ থেকে ২০五十 সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারে এবং সেই ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক রূপান্তরে এই টেলিকম ও আইসিটি খাতই সবচেয়ে বড় ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। টিআরএনবি-র সম্মানিত সভাপতি সমীর কুমার দে’র দক্ষ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য পেশ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দেশের অন্যতম শীর্ষ টেলিকম অপারেটর রবির হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স সাহেদ আলম। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এছাড়া গোলটেবিল বৈঠকে মুখ্য আলোচক হিসেবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী এবং মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকারসহ দেশের প্রযুক্তি খাতের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনরা উপস্থিত থেকে তাদের মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন।



